Breaking News

মাসুদা সুলতানা রুমীর বই সমূহ

ডুবন্ত পুরুষ ও ইসলাম
                            মাসুদা সুলতানা রুমী


০ ইসলাম পূর্বযুগে পুরুষঃ- ইসলাম পূর্বযুগটাকে বলা হয় জাহেলিয়াতের যুগ। সে যুগে চুরি, ডাকাতি, মারামারি, লুটতরাজ, অত্যাচার, অবিচার,ব্যাভিচার, জুয়া,মদ্যপান,নারী হরণ, শিশুহত্যা প্রভৃতি যতো রকমের খারাবী-অশ্লীলতা, পাপ ও দূর্নীতি থাকতে পারে তৎকালিন পুরুষ চরিত্রে তার একটারও অভাব ছিল না। তারা যেনো অমানুষ হয়ে গিয়েছিল। তাদের কে পশুর মতো বল্লে পশুকেও বুঝি অপমান করা হবে। কারন খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া কোনো পশু অন্য প্রানী হত্যা করে না। অথচ এদের মধ্যে ছিল না কোনো প্রকার নীতি নৈতিকতা। স্বার্থপরতা আর গোত্র প্রীতিই ছিল এদের চালিকা শক্তি।

মানুষ নয় পুরুষঃ- মানুষের গুনাবলী এদের মধ্যে তখন ছিলনা। এরা যেনো মানুষ নয় অন্য কোনো প্রজাতি হয়ে গিয়েছিলো। যার নাম পুরুষ। এদের অত্যাচারের আওতা থেকে কেউ বাদ যেতো না। জোর যার মুল্লুক তার  ই ছিলো তাদের মূল মন্ত্র। দুর্বলের উপর অত্যাচার করাই ছিল গৌরবের ব্যাপার। নারী, শিশু, ক্রীতদাস দাসী, গরীব এবং অপরিচিত লোকজন ছিল এদের অত্যাচারের লীলাভূমি। নারীকে ওরা মানুষ হিসাবে মনেই করতনা। সে মা হোক, কন্যা হোক, বোন হোক কিংবা স্ত্রী হোক।

সব পুরুষের একই চেহারাঃ- সব পুরুষই প্রায় একই রকম ছিলো। যে যখন পিতা তখন কন্যা সন্তান হত্যা করা তার নৈতিক দায়িত্ব। যখন সে ভাই, তখন বোনকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা কিংবা বেশী সমস্যা হলে বিক্রি করে দেওয়া তার ইচ্ছার ব্যাপার। আর যখন সে স্বামী তখন তো স্ত্রীর উপর তার পূর্ন মালিকানা। ইচ্ছা করলে রাখতে পারে, তালাক দিতে পারে, বিক্রি করতে পারে, কিছুদিন অন্য পুরুষের কাছে বন্ধক রাখতে পারে। জুয়ায় বাজি ধরতে পারে, অন্য কিছুর বিনিময়ে বদল ও করতে পারে কিংবা মেরেও ফেলতে পারে।
দুর্বল শ্রেনীর মানুষদের এরা গরু ছাগলের মতো হাটে বাজারে বিক্রি করতো এদের জন্য নুন্যতম সহানুভূতি এই পুরুষদের হুদয়ে ছিল না। প্রেম ভালোবাসা এদের অন্তর থেকে নির্বাসন নিয়েছিল।

০ সব শেয়ালের একই রাঃ  একি শুধু আরবে? না এই অবস্থা বিরাজ করছিল পৃথিবীর প্রতিটি দেশে দেশে। পুরুষ কোথাও উপরোক্ত চিত্রের চেয়ে উন্নত ছিল না। বরং আরও নোংরা আর মূর্খ আরও জাহেল ছিল অন্যান্য দেশের পুরুষ নামের প্রানী গুলো।

পঁচা ডোবায় ডুবন্ত ছিল পুরুষঃঅত্যাচার আর নোংরামীর কাঁদায় থিক থিক করছিল পৃথিবী। আর এই পঁচা পাঁকে আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিল পুরুষ। নৈতিক চরিত্র বলতে কিছু ছিলো না এদের। মান সম্মান ইজ্জত বলতেও কিছু বুঝত না। এরা জানত শুধু উদর পূর্তি আর অনৈতিক ফুর্তি। এতে কে সর্বসান্ত হলো আর নির্যাতীত হলো এসব দেখার কোনো বিষয় তাদের ছিলো না।আল্লাহর ভয়, আখেরাতের জবাব     দিহীতা এসব কিছুই তাদের মধ্যে ছিলো না।
এই থিক থিকে কাঁদার মধ্যেই ফুটল একটি শতদল। যার সৌরভে  মৌতাত হয়ে গেলো পৃথিবী। পুতি গন্ধময় সমাজ পুতপবিত্র হয়ে গেলো।

রাসুল সাঃ এর আবির্ভাবঃ

রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটবর্তী হয়। আর তাই বুঝি ইসলাম রবি আগমনের পূর্ব মুহুর্তে পুরুষ ডুবে গিয়েছিল অজ্ঞতা, দুশ্চরিত্রতা, প্রতিহিংসা আর খারাবির গভীর অন্ধকারে। ইসলামের আবির্ভাবে সবকিছুর সাথে পুরুষের হৃদয় ও আলোকিত হলো। সেই আলোতে পুরুষ তার নিজের ভূল ত্র“টিগুলো দেখতে পেলো।

অন্ধকুপ থেকে উদ্ধারঃ অজ্ঞনতার অন্ধকুপ থেকে উদ্ধার পেলো পুরুষ। পুরুষ তার মাকে চিনতে পারলো। ইসলাম তাকে শেখালো “মায়ের পায়ের নিচে সব পুরুষের জান্নাত।” তাকে জানালো পুরুষ ও নারী পরস্পরের ভূষন।
“সন্তানের উপর মাতার হক পিতার চেয়ে তিনগুন অধিক।
নারীর উপর পুরুষের যেমন অধিকার আছে পুরুষের উপরও নারীরও তেমনি অধিকার আছে।
“পিতা যদি তিন, কিংবা দুই কিংবা একটি কন্যা সন্তানও সস্নেহে বড় করে তোলেন আখেরাতে সেই পিতা নবী (সঃ) এর অতি নিকটবর্তী হবেন।
সে জানল “পুরুষ উত্তম কি অধম, মানুষ কি অমানুষ সে ব্যাপারে তার স্ত্রীর বক্তব্যই চুড়ান্ত।
দাস দাসী হলো তার ভাই বোন কিংবা সন্তান সন্ততির মতো। সে দিক নির্দেশনা পেলো “ নিজে যা খাবে দাস দাসীদের কেও তাই খেতে দেবে। নিজে যা পরবে দাস দাসীদের ও তাই পরতে দেবে। অতিরিক্ত কাজের চাপ তার উপর দেবে না। জুলুম করবে না, মারবে না।”

বলা হলো ‘ যে ঈমানদার ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্ত ঈমানদার ব্যক্তিকে খাদ্যদান করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বেহেশতের ফল খাওয়াবেন। যে মুমিন ব্যক্তি কোনো তৃষার্ত মুমিন ব্যক্তিকে পানি পান করায় কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সীল মোহর করা খাঁটি “রাহীক মাখতুম” পান করাবেন। যে মুমিন ব্যক্তি কোনো বস্ত্রহীন মুমীন ব্যক্তিকে পরিধেয় বস্ত্র দান করে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বেহেশতের সবুজ পোশাক পরাবেন।”
 এইভাবে বিভিন্ন শিক্ষা ও দিক নির্দেশনা পেয়ে পুরুষ নিজের স্বার্থের চেয়ে অপরের প্রতি বেশী দায়িত্ববান হয়ে গেলো।

০ পুরুষ এবার মানুষ হলোঃÑ আশরাফুল মাখলুক বা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসাবে আল্লাহ তায়ালা  আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করেছিলেন। আদম সন্তান সেই সম্মান হারিয়ে ফেলে মানুষ নামের অযোগ্য হয়ে পড়েছিলো। ইসলাম তাকে নতুন করে মানুষ করল। প্রেম প্রীতি, ভালোবাসা, দায়িত্বনুভুতি উদারতা পরোপকার,বদান্যতা সব গুণের সমাবেশ ঘটাল তার মধ্যে।
দাহিয়া কালবীর মত ব্যক্তি যে সত্তরটিরও অধিক নিষ্পাপ কন্যা শিশুকে হত্যা করে গৌরব বোধ করেছে। সেই দাহিয়া কালবি কান্নায় ভেংগে পড়েছে। তার কাজের অমানবিকতা ও পাপ বুঝতে পেরে।
ওমর ইবনে খাত্তাবের মতো লোক যে রাসুল (সাঃ) কে হত্যার নেশায় পাগল হয়ে উঠেছিলো সেই ওমর ইবনে খাত্তাব হলেন হযরত ওমর (রাঃ) মুসলিম দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা।

০ জ্ঞানে গুনে সমৃদ্ধঃ- সেই মদখোর, মাতাল, অত্যাচারী খুনি পুরুষেরা যেনো যাদুমন্ত্র গুনে রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে গেলো। তারা হলেন অতিথি বৎসল, সংযমী, পরোপকারী, দাতা, ধীশক্তি সম্পন্ন, আতœত্যাগী, আতœপ্রত্যয়ী, দয়ালু এবং আল্লাহর রঙে রঞ্জিত মহা মানব। জাফর ইবনে আবু তালিবের ভাষায় “আমরা ছিলাম অজ্ঞ জাতি, আমরা মূর্তিপুজা করতাম, মৃত জন্তুর গোশত খেতাম এবং অশ্লীল ও খারাপ কাজে লিপ্ত থাকতাম। আমরা নিকট আতœীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীকে অবজ্ঞা ও দুর্ব্যবহার করতাম। এবং আমাদের মধ্যে যে সবল সে দুর্বলের হক আতœসাত করত।
এমতাবস্থায় আল্লাহতায়ালা আমাদের কাছে আমাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তিকে নবী করে পাঠালেন। আমরা তাকে  সম্ভ্রান্ত বংশীয় ও সত্যবাদী বলে জানি এবং বিশ্বস্ত ও সচ্চরিত্র রুপে তাকে দেখেছি। তিনি আমাদের একমাত্র আল্লাহর এবাদাত করার ও তাঁর একত্বে বিশ্বাস করার আহবান জানালেন। আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য যে সব বস্তু তথা পাথর ও মূর্তি ইত্যাদির পুজা করতাম তা ছাড়তে বল্লেন। তিনি সত্য কথা বলতে, আমানত রক্ষা করা, আতœীয়ের সাথে সদাচরন করা, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং নিষিদ্ধ কাজ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার আদেশ দিলেন। তিনি আমাদের অশ্লীল কাজ করতে, মিথ্যা বলতে, ইয়াতিমের সম্পদ আতœসাত করতে ও নিরাপরাধ নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করতে নিষেধ করলেন।”
উপরোক্ত কথা গুলো হয়রত জাফর তাইয়ার ইনে আবু তালিব আবিসিনিয়ার বাদশা নাজ্জাশীকে বলেছিলেন। উপরোক্ত কথা গুলোর মধ্যে ইসলাম পূর্বযুগ এবং পরবর্তী যুগের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

০ পিতা ভ্রাতা সাথী ও সন্তানঃ- ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে পুরুষ আর অত্যাচারী থাকল না। সে হলো স্নেহশীল পিতা, দায়িত্ববান ভ্রাতা। হলো হৃদয়বান সাথী, আদর্শ সন্তান।
পিতা, পূত্র সন্তানের চেয়ে অধিক যতেœ লালন করতে লাগলো কন্যা সন্তানটিকে। শিক্ষা দীক্ষায় উপযুক্ত করে তাকে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির অংশিদার করে বিয়ে দিল উত্তম পাত্রে। আর ভাই এর দায়িত্বের নমুনা দেখে তো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেলো--।
রাসুল (সাঃ) নব বিবাহিত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন। জাবির কুমারি বিয়ে করেছ না বিধাব করেছ?
জাবির (রাঃ) উত্তর দিলেন ‘বিধবা বিয়ে করেছি।’ রাসুল (সাঃ) বল্লেন ‘বিধবা করলে ক্যান কুমারি মেয়ে বিয়ে করলেই পারতে।
জাবির বল্লেন, “আমার মা ছোট ছোট কয়েক টি কন্যা সন্তান রেখে মারা গেছেন। আমি ওদের বয়সী একটি মেয়ে কে বিয়ে করে আনা পছন্দ করলাম না। আমি এমন একজন মহিলাকে এনেছি যে ওদের দেখাশুনা করতে পারবে। চুল বেঁধে দিতে পারবে এবং শিক্ষা দিতে পারবে।(বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি)
আর আযওয়াজ বা সাথীরা যে কি পরিমান হৃদয়বান হয়েছিলেন তা বোঝা যায় নিন্মোক্ত ঘটনায়Ñ
এক ব্যক্তি স্ত্রীর বকাঝকায় অতিষ্ট হয়ে খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর কাছে এসেছিলেন নালিশ করার জন্য। কিন্তু খলিফার ঘরের দরজায় আসতেই তিনি শুনতে পেলেন খলিফার স্ত্রী রাগতঃস্বরে খলিফাকে বকাঝকা করছে। শুনে ঐ ব্যক্তি যারপর নাই অবাক হলেন। খলিফাকে আর কিছু না বলে তিনি ফিরে চল্লেন। ইতিমধ্যে খলিফা দরজা খুলে বাইরে এলেন। দরজা থেকে ঐ ব্যক্তিকে চলে যেতে দেখে তিনি তাকে ডাকলেন। তারপর জানতে চাইলেন ‘কেনো এসেছিলেন আর কেনোইবা কিছু না বলে চলে যাচ্ছেন। সেই ব্যক্তি বল্লেন,
“আমিরুল মুমিনিন আমি এসেছিলাম আমার স্ত্রীর রুঢ় কথায় অতিষ্ট হয়ে আপনার কাছে নালিশ করতে কিন্তু এখানে এসে শুনলাম আপনার স্ত্রী আপনাকে আরো বেশী কথা শোনাচ্ছে। তাই আমার নালিশ না করে ফিরে যাচ্ছিলাম। এখন আমি আপনার কাছে একটা কথা জানতে চাচ্ছি। আমরা পুরুষেরা আপনাকে বাঘের মতো ভয় করি আর একজন মহিলা কি করে আপনাকে কথা শোনায়?”
হযরত ওমর (রাঃ) বল্লেন, ‘ভাই এই মহিলার অনেক হক আছে যা আমি আদায় করতে পারিনি। তদুপরি এই মহিলা আমার রান্না করে, ঘর বাড়ি কাপড় চোপড় পরিস্কার করে, সন্তানদের লালন পালন করে এমনি আরও অনেক কাজ করে যা করতে সে বাধ্য নয়। এ সব কাজ করে সে আমাকে এহসান করে, অতএব সে তো একজন পাওনাদার আর পাওনা দারের দু কথা বেশী বলার অধিকার আছে।”
ঐ ব্যক্তি  তখন বল্লেন “আমার স্ত্রীর তো এসব কাজ করে এবং আমিও তার অনেক হক আদায় করতে পারিনি। খলিফা হাসি মুখে বল্লেন, ‘তাহলে ভাই একটু সহ্য করো।’
আর সন্তান তো হলো এমন সন্তান যে কিনা মায়ের মৃত্যুর পরও তার হক আদায়ের জন্য পেরেশান থাকে। আর জীবিত থাকতে থাকে মায়ের পূর্ণ অনুগত। এই শিক্ষার ই রেজাল্ট দেখি আব্দুল কাদীর জিলানীর মধ্যে। মা বলেছেন সত্য কথা বলতে তাই বালক আব্দুল কাদীর ডাকাতদের হাতে লুন্ঠিত হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মিথ্যার আশ্রয় নেননি। দেখি শিশু বায়েজিদ বোস্তামিকে মায়ের শিয়বে সারারাত পানির গ্লাস হাতে দাড়িয়ে থাকতে। মায়ের হক, মায়ের মর্যাদা কতোখানি রাসুল সা. তা বাস্তব উদাহরন পেশ করে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। একবার রাসুল সা. এর দুধ মা হালিমা সাদিয়া এলেন রাসুল সা. এর কাছে। রাসুল সা. আবেগের সাথে “আমার মা-আমার মা বলতে বলতে নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে দিলেন তাকে বসার জন্য।ƒূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূ
আবারো হারালো সম্মানঃ-ধীরে ধীরে এই অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। পুরুষ আবার ডুবতে থাকে আধুনিক জাহেলিয়াতের পংকিলতায়। মুসলমানদের অলসতা,বিলাসব্যাসন এবং মুনাফিকি চিন্তা চেতনা ও আচরন সর্বোপরি অশিক্ষা কুশিক্ষার জন্য ইসলাম কোন ঠাসা হয়ে গেলো বিশ্বের প্রতিটি দেশে। তখন দোর্দন্ড প্রতাপে ইংরেজরা মুসলিম রাষ্ট্রগুলো শাসন করল শোষন করল দুইশত বছরের ও অধিক কাল। তারপর এই রাষ্ট্রগুলো বাহ্যিক দিক দিয়ে স্বাধীন হলো ঠিকই কিন্তু আতিœক দিক দিয়ে পরাধিনই রইল। মুসলমান পুরুষেরা পাশ্চাত্য শিক্ষা সংস্কৃতি এমন ভাবে গ্রহণ করল যে নিজেদের শিক্ষা সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য দুরে নিক্ষেপ করে পাশ্চাত্যের রঙে রঙিন হতে সর্বশক্তি নিয়োগ করল। ইসলামের স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা ছেড়ে পান করতে লাগলো পাশ্চতেরূ রঙিন পানি।
পাশ্চাত্যের গোলক ধাধায়ঃ-১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশ ইংরেজদে হাত থেকে স্বাধীন হলো ঠিকই কিন্তু দুইশত বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে পাশ্চাত্যের পন্ডিতরা যে ভাবে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছিলো তা আজও সোজা হয়ে দাড়াতে পারল না।ইংরেজরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুই ভাগে ভাগ করে দিল। একটি আধুনিক শিক্ষা অপরটি মাদ্রাসা বা ইসলামী শিক্ষা। দুইটি ব্যবস্থাই  হলো অর্পূনাংগ। আর এটাই ছিল তাদের একমাত্র কাম্য।বুঝেও না বোঝার ভান করলো তৎকালীন আধুনিক শিক্ষিত  মুসলমানেরা ।আখেরাতকে তারা জলাঞ্জলি দিল। ইসলাম থেকে তারা সরে গেলো বহুদুরে। তাইতো আমাদের বড় বড় বুদ্ধিজীবি ও রাজনৈতিক নেতারা প্রকৃত মুসলমানের মতো জীবন যাপন করেন না।
কায়েদে আযম মোহাম্মাদ আলী  জিন্নাহ তো পোষাক আষাকে চিন্তা চেতনায় সম্পূর্ণভাবে পাশ্চাত্যের প্রতীক ছিলেন। হোসেন শহিদ সোহরোওয়ার্দির অবস্থাও তাই। এরাই ছিলেন তৎকালিন মুসলমানদের বড় নেতা। মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ বিয়েও করেন বিদেশী এক অমুসলিম মহিলাকে। সাধারন মানুষ ও পাশ্চাত্যের গোলক ধাঁধায় এমন ভাবে ধরা পড়ল আজও বের হতে পারল না। যতদিন যাচ্ছে ততই যেন জড়িয়ে যাচ্ছে মাকড়সার জালে। বস্তুবাদী এই শিক্ষা ব্যবস্থায় পার্থিক ভোগ বিলাস ছাড়া নৈতিক, আতিœক প্রশান্তি আখেরাতের চিন্তা সবই যেন মিথ্যা হয়ে গেলো। এই শিক্ষায় মানুষ হয়ে গেলো এক উন্নত জাতের পশু। পার্থিব জ্ঞান বিজ্ঞানে এরা যত উন্নত হলো নৈতিক দিক দিয়ে ততোধিক নিচে নেমে গেলো।
শিক্ষার অপর ধারাটি যা মাদ্রাসা শিক্ষা বা ইসলামী শিক্ষা নামে পরিচিত তাও একমুখি হয়ে গেলো। জ্ঞান বিজ্ঞান থেকে দুরে সরে শুধু কোরআন মুখস্ত করা আর ফিকহ ও মাজহাবি মত বিরোধে লিপ্ত হওয়ার জন্য সেই ৫০ বছর আগে ইংরেজরা যে পাঠ্যক্রম সাজিয়ে রেখে গিয়েছিলো। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তে লাগলো। ফলে তারা আলেম হল, মাওলানা হলো-আল্লামা হলো কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ মুসলমান কমই হলো। যদিও এদের মাধ্যমেই ইসলাম টিকে থাকল। এরা কোনো সরকারী পদ পেলো না। মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিন আর মাদ্রাসার শিক্ষক হওয়া ছাড়া জিবিকার আর কোনো মাধ্যম না পেয়ে আধুনিক শিক্ষিতদের চেয়ে আর্থিক অনটনেই চলতে লাগলো এদের যাপিত জীবন। আর এইমসজিদ মাদাসা গুলো চলতে লাগলো সাধারন মুসলমানদের দান দ্িথনায় ।                    ধীরে ধীরে কুসংস্কারের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল ইসলাম। আর এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হলো নাবী। পুরুষেরা আবার জালেমের ভুমিকায় চলে আসতে লাগলো।

শুরু হলো বিভেদঃ- বাড়ির ছেলেটিকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করলেও প্রায় সবক্ষেত্রেই মেয়েটিকে সে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলো। মেয়েকে না বুঝে কোরআন পড়া আর নামাজ রোজা শেখানোই যথেষ্ট মনে করল প্রবীন মুসলমানেরা। কোনো কোনো পরিবারের এক ছেলে আধুনিক শিক্ষায় হয়ে গেলো নাস্তিক আর এক ছেলে আধুনিক ধ্যান ধারনা বর্জিত মাওলানা বা হাফেজ। আর মেয়েটি হলো সর্বদিক দিয়েই মুর্খ। মাওলানা বা হাফেজ সাহেব আধুনিক শিক্ষিত ভাইকে মনে করে কাফের। আর আধুনিক সাহেব মাওলানা ভাইকে মনে করে কাঠমোল্লা। এভাবেই শুরু হয় বিভেদ ও বিদ্বেষ।

ভালো লাগে ফোটা ফুলঃ- পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত পুরুষের চোখে তখন নিজ সমাজের পর্দায় আবৃত মুর্খ মেয়েদের চেয়ে পাশ্চাত্যের বিদুসী রুপবতী বেপর্দা মেয়েদেরই ভালো লাগতে লাগলো। তারা আমেরিকা, রাশিয়া, ইংল্যান্ড থেকে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে বেহায়া বেলাজের তালিম ও অনৈসলামিক সভ্যতা নিয়ে এলো। তথাকথিত প্রগতির পথে উত্তরনের জন্য শিক্ষায় নামে আধুনিকতার নামে মুসলিম মেয়েদের ঘর থেকে বের করতে লাগলো। তাদের বে আব্র“ করে রাস্তা ঘাটে, দোকান পাটে অশ্লিল নাচগানে, সিনেমা থিয়েটারে অফিস আদালতে বিপনি বিজ্ঞাপনে নিয়ে এলো। ধীরে ধীরে ইসলামী মূল্যবোধ এদের মধ্য থেকে একেবারে লোপ পেলো। যার যতো সল্প বসন সে যেনো তত বেশী প্রগতি সম্পন্ন নারী হিসাবে পরিহিত ততবেশী প্রগতি সম্পন্না নারী হিসাবে পরিচিত হতে লাগলো। বাবা আদম (আঃ) এবং মা হাওয়া শয়তানের ধোকায় পড়ে আল্লাহ পাকের নিষেধ লংঘন করে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার সাথে সাথে তাদের ুুপোষাক শরীর থেকে খুলে পড়েছিল। আধুনিক শিক্ষিতা মেয়েদের ও হলো সেই অবস্থা।
পুরুষদের জন্য ুআল্লাহ পাক ফরজ করেছেন পায়ের গোুড়ালির উপর থেকেু নাভীর উপর পর্যন্ত পোষাকে আবৃত রাখা। আর মেয়েদের জন্য হাতের পাতা পায়ের পাতা ও মুখ মন্ডল ব্যাতিত সর্বাঙ্গ। ুঅথচ একেবারে উল্টে  গেলো ব্যাপারটা। আধুনিক পুরুষ পাযের পাতা পর্যন্ত প্যান্ট কোট টাই পড়ে গোটা দেহ আবৃত করে আর আধুনিকা নারী যে পোষাকই পড়–ক দেহের বারো আনা বের করে রাখে। এটাই প্রগতির মাপকাঠি। এতে নারীর উপকার হলো না বরং  ঘরে বাইরে সে অসহায় হয়ে পড়ল চরম ভাবে। তারা নির্যাতিত হতে থাকল যত্রতত্র। কারন ইসলাম থেকে দূরে সরে যেয়ে পুরুষ আবার সেই জালেমের ভুমিকায় চলে গেছে। তাই তো ঘরে স্বামী নামের পুরুষটির হাতে হতে লাগলো যৌতুকের বলি আর অফিসে-সহকর্মী বা বসের হাতে-রাস্তায় সহযাত্রিদের কাছে সবত্র দৈহিক ও মানুষিক অত্যারের শিকার।

যত দোষ নন্দ ঘোষঃ- এই পরিস্থিতি তে নারী পুরুষের প্রতি পক্ষ হয়ে দাড়াল। পাশ্চাত্যে যে ভাবে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে গেছে। ভেঙ্গে গেছে পরিবারের অবকাঠামো আমাদের দেশেও সেই সভ্যতার সয়লাব বয়ে যেতে লাগলো। নারী-নির্যাতন, নারী অপহরন, খুন, এসিড নিক্ষেপ চরম ভাবে বৃদ্ধি পেলো। নারী সর্বত্র হয়ে পড়ল অরক্ষনীয়। আধুনিক শিক্ষার বদৌলতে নারী অবক্ষনীয়া হলেও অবলা  রইল না। পুরুষকে জব্দ করার জন্য সেও বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে লাগলো। আইনি লড়াইতে জিতে সে কখোনো পুুরুষকে জেল খাটালো আবার সুযোগ বুঝে পুরুষ তাকে এসিড নিক্ষেপ করল। পত্রিকা খুললেই স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন যেন খুব স্বাভাবিক খবর হয়ে দাড়িয়েছে। এই অবস্থা উচ্চবিত্ত এবং তথাকথিত উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই সীমা বদ্ধ থাকল না ছড়িয়ে পড়ল তৃনমূল পর্যায় পর্যন্ত। তখন এইসব নারী আর নারী বাদী পুরুষেরা তারস্বরে চিৎকার করতে লাগলো। যৌতুক বন্ধ করো নারী নির্যাতন বন্ধ করো বলে। কে বন্ধ করবে? এরা নিজেরাই তো নিযাতনকারী। কিন্তু সবদোষ নন্দ ঘোসের মতো করের এরা নারীর নিরাপত্তা রক্ষাকারী ইসলামের উপর সব আক্রোশ ঢেলে দিল। বলতে লাগলো ইসলাম ই নারী কে বন্দী করেছে। ব্যক্তি থেকে, পরিবার থেকে সমাজ থেকে ইসলামকে দুর করতে পারলেই নারী মুক্তি পাবে। মূল্যায়ন পাবে তার প্রতিভার। যে ইসলাম ১৪০০ বছর আগে অত্যাচারী কামুক পুরুষের হাত থেকে নারীকে রক্ষা করেছিল। আর শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করে পুরুষকে মানুষ বানিয়েছিল সেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি ইসলামকে সর্বদিক দিয়ে অভিযুক্ত করা হলোÑইসলামকে নির্বাসন দেওয়ার পায়তারা চল্ল।

আবু জাহেলের নতুন রুপঃ ঘরে ঘরে নতুন রুপে দেখা দিল আবু জাহেল। ইসলামের বিরোধীতায় এরা যেমন প্রাচীন আবু জেহেলের চেয়ে অনেক বেশী অগ্রসর তেমনি নারীদের উপর অত্যাচারের ক্ষেত্রেও এদের জুরি মেলা ভার। হেন প্রকারের অত্যাচার নেই যে তারা নারীদের উপর করে না।
নারী যখন মা তখন ‘তুমি কি বোঝ?’ বলে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে মোটেও কুন্ঠিত হয় না। যখন বোন তখন তাকে অবহেলা আর লাঞ্চনায় একপাশে ঠেলে দিল। যখন স্ত্রী তখন তো আর কথাই নেই-প্রথমেই তার কাছ থেকে বিপুল পরিমান যৌতুক আদায়ের জন্য মানষিক তারপর দৈহিক নির্যাতন শুরু করে। কেউ কেউ আবার নিজেকে ভদ্র এবং মুসলমান বলে দাবী করে তারা প্রত্যক্ষভাবে যৌতুকের কথা না বলে পরোক্ষভাবে বলে। তথা কথিত নারী হিতৈসীরা তখন উপদেশ দেয় ‘নারীকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বনির্ভর হতে হবে তাহলেই শান্তির পায়রা ঘরে ঢুকবে। কিন্তু কই? তারপরও তো শান্তির দেখা মেলে না। ফাহিমা বেগম প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। তার স্বামী আজাহার সাহেবও শিক্ষক। নিজের বেতনের টাকা ফাহিমা বেগম কোনোদিন নিজে তুলে আনেন ন॥ আজাহার সাহেবই আনেন এবং তার কাছেই রাখেন। ফাহিমা বেগম স্কুলে যাওয়ার আগে কিছু রান্না করে যান আবার বিরতি টাইমে এসে বাকি রান্না করেন। একদিন বল্লাম ‘রান্নাটা কাজের বুয়াকে দিয়ে করালে হয় না? ফাহিমা বেগম বল্লেন ‘না উনি আবার কাজের বুয়ার হাতের রান্না খেতে পারেন না।”
এর নাম কি ভালোবাসা না অত্যাচার? শুধু এই না আরো আছেÑ ফাহিমা বেগমকে ঘর সংসার গুছিয়ে রাখতে হয়। ছেলেমেয়ের পড়াশুনার দায় দায়িত্ব নিতে  হয়। আজহার সাহেবের কাপড় চোপড় ইস্ত্রি করে গুছিয়ে রাখতে হয়। মাঝে মাঝে পা টিপেও দিতে হয়। এই সব কাজ ঠিক মতো না হলে মাঝে মাঝে ‘সংসার করার অযোগ্য মহিলা’ বলে ভৎর্সনাও শুনতে হয়।
অথচ দৈনিক আট ঘন্টা চাকুরী করার পর ফাহিমা বেগমদের উপর এই সব কাজের বোঝা চাপানো কি মস্তবড় জুলুম না?
স্ত্রী যখন ইনকাম না করে তখনকার অত্যাচার আবার অন্য রকম। তখন প্রায়ই শুনতে হয় ‘রোজগার করতে হয় না তো তাই বোঝ না কত ধানে কতো চাল! বল্লেই সব পাওয়া যায়- ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক ধরনের কটু কথা। না আমি সবার কথা বলছি না কিছু ব্যতিক্রম পরিবার আছে। কিন্তু তাকে আমি ব্যতিক্রমই বলব। কারন আমাদের সমাজের অধিকাংশ পরিবারের চিত্রই উপরে উল্লেখিত চিত্রের মতো। এর একমাত্র কারন ইসলাম থেকে আলকুরআন থেকে দুরে সরে যাওয়া।
সদ্য বিবাহিত যুবক আহমাদ। খুব গর্বের সাথে বল্ল “আমি আমার বড় ভাইয়ের মতো বউ’র কাজ করে দেবনা।এক ইংরেজ দম্পতির নাকি মশারি টানানো নিয়ে শেষ পর্য়›—  বিয়ে ভেঙ্গে যায়। দরকার হলে তাই যাবে তবু মশারি টাঙ্গাতে যাব না।”
তার মানে ঘর সংসারের কাজে সে কোন দিন স্ত্রীকে সহোযোগিতা করবে না।বল্লাম;’’ঘরসংসারের কাজে  স্ত্রী কে সহোযোগিতা করা তো  সুন্নত।


সর্বশান্ত হলো নারীঃ- আঠারো বছর এক সাথে থাকার পর ভেঙ্গে যায় নুর জাহান আর দুলালের সংসারটি। তিনটি সন্তানের উপস্থিতি ও ধরে রাখতে পারে না, ফেরাতে পারেনা অনিবার্য ভাঙ্গনের হাত থেকে সংসার টিকে। তিনটি সন্তান নিয়েই চলে আসে নুরজাহান ভাইয়ের আশ্রয়ে এবং তা ভাই এর পরামর্শেই। এই সংসারের হাড়ি পাতিল প্লেট বাটি-চেয়ার টেবিল খাট আলমারী সোকেচ থেকে টয়লেটের প্যান পর্যন্ত নুরজাহানের পছন্দে কেনা। স্বল্প আয়ের দুলালের উপার্জন থেকেই তিল তিল করে জমা করে, নিজে মাঝে মাঝে দর্জিকাজ করে টাকা পয়সা জমিয়ে এই সব ক্রয় করেছে নুরজাহান। এই বাড়ির প্রতিটি জিনিষের সাথে ওর হাতের ছোঁয়া লেগে আছে। এই মেহগনি গাছ গুলো নিজে লাগিয়েছে। গাছে পানি দিয়েছে। এই আম গাছ-আরও কি কি যেনো অনেক গাছ। কারো গরু ছাগলে নষ্ট করলে তাদের সাথে ঝগড়া করেছে। আঠারোটি বছর সে এই সংসারের সব জিনিষকে আমার আমার বলেছে। যদিও প্রথম থেকেই দুলালের সাথে খুব একটা বনিবনা ছিল না। নুরজাহান এই সবকিছুকেই নিজেরই মনে করত। রোদ বৃষ্টি ঝড় ঝাপটার মতো শান্তি অশান্তির মধ্য দিয়েই তিনটি সন্তানের মা বাবা হয়েছে ওরা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কি কারন সঠিক বলতে পারব না। উভয় উভয়কে দোষারোপ করে। সে যাই হোক ডিভোর্স দিয়েছে দুলালÑবাড়ি এবং বাড়ির প্রতিটি জিনিষ ছেড়ে চলে এসেছে নুরজাহান। এতোদিনে নুরজাহান বুঝল এ বাড়ি এই সংসার এই বাগান-গাছপালা কিছুই তার নাÑতাহলে এই আঠারো বছর সে এই সংসারের কি ছিল? কেয়ার টেকার? এই সংসারের উপর কি নুরজাহানের কোনো মালিকানা ছিল না? দুলাল সেই সাজানো সংসারে আর এক নারীকে নিয়ে এসেছে।  সন্তান তিনটি স্তব্ধ বিমুঢ়। তারা যদিও মায়ের কাছেই আছে কিন্তু দুজনের স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। ভাই এর পরামর্শে নুরজাহান মামলা করেছে দুলালের নামে ওর প্রাপ্য মোহরানা আর বাচ্চাদের খোরপোষের দাবীতে। দুলালও রাজী তা দিতে। যদিও বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও এই পর্যন্ত দুলাল কিছুই দেয়নি। ব্যাস মামলা শেষ। সম্পর্ক শেষ। আঠারো বছরের সংসার শেষ। সমাজে এই হল নারীদের অবস্থান। এর জন্য দায়ী কে?
নুরজাহান তবু সন্তানদের বুকে নিয়ে আছে। রোকেয়ার ব্যাপারটাতো আরো অন্যরকম। রোকেয়ার স্বামী বিয়ে করার কারনে রোকেয়া ই ডিভোর্স দেয় স্বামী ইমরান কে। এবং বাড়ী থেকে চলে যায় রাগ করে। সেই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া। রোকেয়া আবার বিয়েও করেছে কিন্তু সন্তানদের কথা মনে হলে কলিজাটা ছিড়ে যেতে চায়। ছুটে চলে আসতে ইচ্ছে করে কিন্তু তা কি করে সম্ভব? সমাজে খুজে দেখেন এমনি হাজার হাজার নুরজাহান আর রোকেয়া পাবেন। সংসারটা মেয়েরা নিজেদের মনে করলেও আসলে সংসারে তাদের কোনো অধিকার নেই। এটাই বাস্তব। স্বামীর সাথে সম্পর্ক নষ্ট হলে তাকে সবকিছু ফেলে নিঃস্ব হয়ে ফিরে যেতে হয় ভাই এর সংসারে। অথচ ইসলামের নির্দেশ ‘স্বামী যদি তাকে পাহাড় সমান দ্রব্য সামগ্রীও দিয়ে থাকে বিবাহ বন্ধন ভেঙ্গে গেলে তা থেকে সে কিছুই ফেরত নিতে পারবে না।” নারীদের পক্ষে বহু আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই কোথাও।

১.    মনের সন্তুষ্টি সহকারে ফরজ মনে করে স্ত্রীদের মোহরানা পরিশোধ করো। (সুরা-
২.    স্ত্রীকে যদি পাহাড় সমান সম্পদ ও দেওয়া হয় (তালাকের পর) স্বামী তা থেকে কিছুই ফেরত নিতে পারবে না।
৩.    ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় তার ভরনপোষন দেবে।
৪.    সন্তান মায়ের কাছে থাকলে তার খরচ পিতাকেই দিতে হবে।
অথচ আমাদের পুরুষ সমাজ এর একটাও মানতে রাজি নয়। তালাক প্রাপ্ত স্ত্রী তার তথাকথিত সংসারের সবকিছু ছেড়ে একেবারে শুন্য হাতে ফিরে আসে বাবা কিংবা ভাইয়ের সংসারে। কোনো কোনো জায়গায় তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নির্দয় পুরুষ শিশু সন্তানকেও আটকে রাখে মা’কে দেয় না। আর মা যদি কোনো রকমে সন্তান নিয়ে আসে তাহলে তার খরচ অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষ তা দেয় না। তখন এই সব নুরজাহান রোকেয়াদের বাধ্য হতে হয় আবার নতুন করে কোনো পুরুষের বাসর ঘরে প্রবেশ করতে। আবার ঠিকানা বদল হয় নারীর।
কারন এরা যে আধুনিক জাহেলিয়াতের নির্যাসে লালিত পুরুষ। রাসুল সা. এর সংস্পর্শে যে পুরুষ-মানুষ হয়েছিল তারা বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তা নারীদের বিয়ে করলে তাদের শিশু সন্তানদেরও সন্তানের মতো আদর যতœ করত। অথচ বর্তমান সমাজের পুরুষেরা এই সব সন্তানদের শত্র“ই মনে করে।

দুইটি সন্তান নিয়ে বিধবা হয়েছে আলিয়া। একটির বয়স পাঁচ বছর অন্যটি তিন বছর। স্বামী মারা যাওয়ার চার মাস দশদিন পার হতে না হতেই স্বামীর বড় ভাই এবং ছোট ভাই এর তরফ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। অবাক আর দিশেহার হয়ে পড়ে আলিয়া। ভাসুর কে অনুনয় করে বলে,“বিয়ে করতে হবে কেন? আমি তো এ বাড়িরই বউ। এই সন্তানরা তো আপনারই ভাইয়ের ছেলে। আমি কোনো দিন বিয়ে করব না আমি আপনাদের মৃত ভাই এর বিধবা স্ত্রী হয়েই এই সংসারে থাকতে চাই। কিন্তু এসব অনুনয় বিনয়ে কাজ হয় না। বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে বাড়ি ছাড়া করার প্রচেষ্টা চালায় মৃতের বড় ভই। তখন এক সহৃদয় পুরুষ এগিয়ে আসে অসহায় আলিয়ার সাহায্যে। বিভিন্ন প্রকার সাহায্যের আশ্বাস আর প্রলোভনে ভুলে যায় আলিয়া। এই পুরুষটি যখন আলিয়ার সন্তান দুটির লালন পালন শিক্ষা দিক্ষার দায়ভার নিতে চায় তখন আলিয়া যেনো অকুলে কুল দেখতে পায়।

বাচ্চা দুটিকে নিয়ে বাপের বাড়িতে বেড়াতে এসে আলিয়া বিয়ে করে পুরুষটিকে। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই বাচ্চাদের সাথে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করে পুরুষটি। কারনে অকারনে মারপিট করে। উপায়ন্তর না দেখে আলিয়া আবার ফিরে আসে পুর্ব স্বামীর বাড়িতে। বাচ্চাদের রেখে আলিয়াকে তাড়িয়ে দেয় আলিয়ার ভাসুর। অনেক কান্নাকাটি করেও সেখানে ঠাই পায় না আলিয়া। অশ্লিল গালাগালি শুনে বাচ্চাদের রেখে চলে যেতে বাধ্য হয়। ভাইদের সংসারেও ঠাঁই হয় না। বাবা নেই- মা ছেলেদের সংসারের বোঝা-মেয়েকে আশ্রয় দেওয়ার সাধ্য তার নেই। তাই সেই দুর্ব্যবহারকারী স্বামীর কাছেই ফিরে যেতে বাধ্য হয় আলিয়া বেগম।

এমনি হাজার হাজার ঘটনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পরিত্যাক্ত পলিথিনের মতো সমাজের আনাচে কানাচে সর্বত্র। পত্রিকা খুললেই ‘স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন’ যেনো একটা নিত্য নৈমক্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। খুন হওয়ার কারণ গুলোও নির্ধারিত। স্বামীর যৌতুকের দাবী কিংবা পরকীয়ায় স্ত্রীর বাধা প্রদান।আর পত্রিকার খবরটা আসে তো খুন হওয়ার পরে। খুন হওয়ার আগে ঐ স্বামী পদাধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিটি কত ধরনের নির্যাতন যে করে তা কিন্তু পত্রিকায় আসে না। দৈহিক নির্যাতন, মানষিক নির্যাতন-যাহিরি নির্যাতন, বাতনী নির্যাতন-আহা! নির্যাতনের কতো যে রূপ।
বিভিন্ন জিলার বিভিন্ন বৈঠকাদিতে আমি যাই আর সেই সুবাদে অনেক মহিলার সাথে পরিচয়। এই পরিচিতদের মধ্যে ধনী, গরীব, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধার্মিক, অধার্মিক, চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষিকা, ছাত্রী, গৃহিনী, সাদা, কালো, সুন্দর, অসুন্দর সব ধরনের মহিলাই থাকেন। এদের সাথে একান্তভাবে কথা বলে দেখেছি ৮০% মহিলা তথাকথিত স্বামীদের দ্বারা নির্যাতিত। স্বামীদের প্রতি তাদের প্রচন্ড অভিযোগ। আর সংক্রামক ব্যধির মতো দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এই অবস্থা। পরিপ্রেক্ষিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিবাহ বিচ্ছেদের মতো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। নিষ্পাপ শিশু সন্তানেরা হচ্ছে মাতৃহারা অথবা পিতৃহারা। আর এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে পুরুষই দায়ী।
কারণ আলকুরআন ও হাদিসের শিক্ষা থেকে অনেক দুরে সরে গেছে বর্তমান পুরুষ সমাজ (মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে) যে সব পুরুষ কুরআন হাদিস পরে তারাও যেনো ইসলামের সঠিক শিক্ষা বুঝতে পারছে না।
মাওলানা কাসেম সাহেব অসম্ভব ধার্মিক লোক। অল্প বয়সেই হজ্জ করে এসেছেন। কুরআন এবং হাসিদের শিক্ষা নিয়েই জীবন সাজাতে চান। পাড়া প্রতিবেশী আতœীয় স্বজন সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক। কিন্তু স্ত্রী সালমা তাকে ভয় পায় বাঘের মতো। একবার তার চার বছরের ছেলে সালমা বেগমের অজান্তে বাবার (কাসেম সাহেবের) সাথে বাজারে চলে যায়। সালমা বেগম এঘর ওঘর ছেলেকে না পেয়ে পেরেশান হয়ে পরে। গেট খুলে রাস্তায় আসে। রাস্তায় এসেই দেখে রাস্তার ওপারে ছেলের হাত ধরে দাড়িয়ে আছেন কাসেম সাহেব। ছেলেকে দেখে সালমা স্বস্তি পেলেও কাসেম সাহেবের চোখ দেখে সালমা ভীত হয়ে পরে।কিন্তু কাসেম সাহেবের রাগের কারণ খুঁজে পান না সালমা বেগম। সালমা বেগম ছেলেকে কোলে তুলে নিতে কাসেম সাহেবের কাছে এগিয়ে যেতেই সালমা বেগমের মুখের উপর কয়েকটা থাপ্পর আর পিঠের উপর কিল বসিয়ে দিল। হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য কাসেমের একবার ও মনে হলো না প্রকাশ্য রাস্তার উপর কাজটা কতো খানি খারাপ হলো। লজ্জায় মৃতপ্রায় সালমা বেগম কোনো মতে বাড়ির ভেতর চলে আসে। কাসেমের গালি আর বকাবকিতে অবশেষে সালমা বেগম তার অপরাধ বুঝতে পারে। সালমার অপরাধ-“ছেলে কি করে তার অজান্তে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো?”
পাড়ার কোনো উঠতি মাস্তান যদি কাসেম সাহেবকে শালা বলে সে তখন বিড়ালের মতো মাথা নিচু করে চলে আসে। তার বাঘের মতো হুংকার শুধু সালমা বেগমের কাছে।
এদিক দিয়ে আবার রাসুল সা. এর সুন্নত আদায়ের ব্যাপারে খুবই সজাগ। এই তো কয়েকদিন আগের কথা। রাত প্রায় বারোটার দিকে ঘুম থেকে সালমা কে ডেকে তোলে।“এসো তো একটা সুন্নত আদায় করি।” বলে খোলা মাঠে নিয়ে এসে দৌড় প্রতিযোগীতা করে।
কি বলব এইসব আহাম্মক আর দুর্ভাগা কাসেম সাহেবদের। স্ত্রীদের গায়ে হাত তুলতে রাসুল সা. কড়া ভাবে নিষেধ করেছেন। আর মুখে মারা তো কবীরা গুনাহ। রাসুল সা. বলেছেন “ ঐ পুরুষ উত্তম যে তার স্ত্রীর বিবেচনায় উত্তম।” কিন্তু এইসব কাসেম সাহেবরা কি স্ত্রীর বিবেচনায় উত্তম হতে পারবে?
রাসুল সা. এর সুন্নত আদায় করতে যেয়ে স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিযোগীতা করলো আর তাকে মারল কার সুন্নত অনুযায়ী?

অশান্তির দাবানলঃ- পারিবারিক অশান্তি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে যে যাই বলুক না কেন মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, আমাদের সমাজের লোকেরা আল্লাহর দেওয়া বিধান থেকে দুরে সরে গেছে। আর এর জন্য অবশ্যই দায়ী পরিবারের কর্তা পুরুষটি। অনেকেই বলতে পারেন কর্তা পুরুষটি এর জন্য দায়ী হবেন কেন? মহিলাটি দায়ী হতে পারে না?
না। মহিলাটি দায়ী হবেন না কারণ মহিলাটির কর্তাও ঐ পুরুষটি। সেবা পাওয়ার বেলায় তিনি কর্তা, বকাঝকা করার সময় (সত্যিকারের শাসন না) তিনি কর্তা। অতএব ইসলামী অনুশাসন অনুযায়ী একটি সুখি ও সমৃদ্ধ পরিবার গঠনের সময় ও তিইি কর্তা।
সত্যি কথা বলতে কি, সমাজের শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনী- গরীব, সচেতন অসচেতন প্রত্যেক মহিলাই ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক পুরুষটির আনুগত্য করে। অতএব ঘরের কর্তা পুরুষটি যদি নিজে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে এবং স্ত্রী ও সন্তানদের প্রথম থেকেই সেই ভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তাহলে সংসারটা শান্তির ঠিকানা হবে ইনশাল্লাহ। তা না করে মহিলাদের উপর দায় আর দোষ চাপালে কাজ হবে না। সেই দিন আল্লাহর দরবারে হাজির হলেই আসল তথ্যটি জানা যাবে।

শুধু চাইলেই হবে নাঃ- কুদ্দুস সাহেব চাকুরী করেন কুয়েত সিটিতে। দীর্ঘদিন থেকে ওখানেই আছেন। চার সন্তানের জনক। ছোট ছেলেটি বুঝি বাপের চেহারা ভুলেই গেছে। কুয়েত যেয়ে কুদ্দুস সাহেবের আমুল পরিবর্তন এসেছে। পেছনের সকল ভুল ত্রুটি থেকে খাস ভাবে তওবা করেছেন। বাকি জীবনটা আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা যে ভাবে সন্তুষ্ট হন সেই ভাবে অতিবাহিত করতে চান। শুধু নিজের জীবন না স্ত্রী পুত্র কন্যারাও যাতে ইসলামী বিধি বিধান মেনে চলে এটাই তার একমাত্র চাওয়া। এমনকি সমাজ দেশ নিয়েও তিনি ভাবেন। কিন্তু তার স্ত্রী পূত্র কন্যারা কেউ তার ভাবনার শরিক হতে চায় না। বলতে গেলে তার প্রত্যেকটা কথারই বিরোধীতা করে তারা। তাদের চিন্তাধারা আর কুদ্দুস সাহেবর চিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সমাজের আর দশজন অনৈসলামীক মুসলমানের মতোই তাদের চিন্তা চেতনা এবং কর্মকান্ড। কুদ্দুস সাহেব কষ্ট পান সন্তানদের কর্মকান্ডে। তিনি চান তার চিন্তা ভাবনা এবং জীবনধারার মতো তার পরিবার পরিজনও যদি হতো.......। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? কাছে থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্তানদের ঠিক রাখা যায় না.... আর সেই দুর দেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে আর ফোনে কথা বলে পরিবার পরিজনকে আল্লাহর দিক নির্দেশান অনুযায়ী পরিচালনা করা কি করে সম্ভব? শুধু চাইলেই তো হবে না- বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। কুদ্দুস সাহেব সেই পদক্ষেপ নিতে পারেন নি। আর তাছাড়া কুদ্দুস সাহেবের স্ত্রীকেও ইসলাম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ই বলা যায়। আমাদের সমাজের আর দশটি সাধারন মহিলা যেমন। আর একটি পরিবারের কথা বলি, যে পরিবারের গৃহকর্তী ভদ্রমহিলা ইসলামী বিধি বিধান সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। তিনি নিজে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান সঠিক ভাবে মেনে চলার চেষ্টা করেন এবং স্বামী ও পূত্ররা মেনে চলুক তা প্রাণ দিয়ে চান। কিন্তু তার স্বামী ও পূত্ররা তার এই চাওয়াটাকে বাড়াবাড়ি মনে করে।
যেমন তিনি চান , তার ছেলেরা এবং ছেলেদের বাবা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদেই পড়–ক। তারা সবাই ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় হোক। তারা প্রতিদিন আল কুরআন থেকে, হাদিস থেকে কিছু পাঠ করুক। কিন্তু কই তাতো ঠিক মতো হয় না। এ ব্যাপারে গৃহ কর্তাকে যদি একটু চাপ দেওয়া হয় তিনি বলেন,“শোন তুমি খামাখা মন খারাপ করো না তো। কে জান্নাতে যাবেন কে জাহান্নামে যাবেন আল্লাহপাক তা নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমি যদি জান্নাতি হই তাহলে আমাকে দিয়ে আল্লাহপাক অবশ্যই ভালো কাজ করাবেন। আর যদি জাহান্নামী হই তাহলে তুমি যতোই চেষ্টা করো না কেন আমাকে দিয়ে ভালো কাজ করাতে পারবা না। ভাগ্যে যা আছে তা হবেই....।”
আবার ছেলেদের বুঝাতে গেলে বলে “ শোনেন আম্মা, আব্বু নিশ্চয়ই কম বোঝে না।” অতএব ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কি করার আছে?”
আমাকে অনেকেই বলেন, “আপা আদর্শ পরিবার গঠনে নারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে কিছু লেখেন।” আসলে আমার মনে হয় কি জানেন? আদর্শ পরিবার গঠনে নারী একা কিছুই করতে পারে না। যদি আদর্শ পুরুষ তার সহকর্মী, সহযাত্রী এবং সহধর্মী না হয়। আমাদের সমাজে একটা কবিতার লাইন খুব প্রচলিত। কার তৈরী করা পঙতি জানি না।
        “সংসার সুখের হয় রমনির গুণে”
এর পরবর্তী পঙতিটি অনেকেই জানেন না। পরবর্তী পঙতি হলো “সুযোগ্য পতি যদি থাকে তার সনে।”
সুযোগ্য পতি না থাকলে রমনীর পক্ষে সংসারটা আদর্শ রুপে গড়ে তোলা কিছুতেই সম্ভব না। পরিতাপের বিষয়- আমাদের সমাজে সুযোগ্য পতির বড়ই অভাব।
শুধু পতি বল্লে ভুল হবে। সুযোগ্য পিতার ও ভীষন অভাব আমাদের সমাজে। একদম নেই তা বলব না। আছে তবে বিরল। সংখ্যায় কম।
অধিকাংশ ঘরেই পিতা পুত্রের সম্পর্ক ভালো রাখতে গৃহিনীকে বিরাট ভ’মিকা রাখতে হয়। ছেলের কথা, সমস্যা, চাহিদা, এমনকি ভাষাও মনে হয় বাবা বোঝে না কিংবা বুঝতে চায় না। আর ছেলেও বাবাকে সব বোঝাতে পারে না কিংবা বোঝাতে চায় না। যতো দুর সম্ভব দুরে থাকার চেষ্টা করে। তখন সম্পর্কের সেতু বন্ধনের কাজটি করতে হয় নারীকে। মজার ব্যাপার হলো এই বিষয়টা কেউ বোঝে না। বাবা ও না ছেলেও না। না বোঝার কারণ বোধ হয় একটাই- তারা উভয়েই পুরুষ।

সব বোঝে তারপরওঃ- আমি আবার বলব পুরুষ নারীর কাওয়াম বা পরিচালক। এ কথা ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক সব নারীরাই মানে। কারণ আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা নারীকে তা মানতে বাধ্য করেছেন। তাই পুরুষ যদি তার কাওয়াম বা পরিচালকের দায়িত্বটা সঠিক ভাবে পালন করতো তাহলে কোনো সমস্যাই হতো না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা স্বৈরাচারী পরিচালক হয়ে গেছে। সে ভালো করুক, মন্দ করুক, গালাগালি করুক, মারপিট করুক, দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করুক আর না করুক, তাকে কিছু বলার কেউ নেই এই পরিবার কিংবা সমাজে। সে যেন ভুলেই গেছে তাকে এই দায়িত্ব এবং পদমর্যাদা যিনি দিয়েছেন তার কাছে জবাবদিহী করতে হবে। নিজের হাত পা চোখ কানের স্বাক্ষীর দ্বারা অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। কখনো কখনো তো সে পুরাপুরি ইবলিশের মুরিদ হয়ে যায়। ইবলিশ যেমন সব দেখে শুনে বুঝে সুঝে আল্লাহর নাফরমানী করেছিল। এই মানুষেরাও অনেক বোঝে, অনেক জানে তারপরও আল্লাহর নাফরমানীতে নিমজ্জিত হয়। সব অনৈতিক কাজের সাথে এরা নারীদের প্রতি নির্যাতনও অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে স্ত্রীদের উপর এবং তা স্বামীত্বের জোরে।

ভুলে গেছে ঠিকানাঃ- আমাদের স্থায়ী ঠিকানা জান্নাতে এই সব পুরুষেরা তাদের ঠিকানা ভুলে গেছে। দুনিয়াকেই মনে করে নিয়েছে স্থায়ী নিবাস। তাই মনে হয় অন্যায় করতে জুলুম করতে একটুও পিছপা হয় না।
আমার বাড়ির সামনেই একটা বাড়ি তৈরী হচ্ছে। বিশাল অট্টালিকা।যিনি বাড়ি করছেন তিনি সামান্য এক পুলিশ কর্মকর্তা। সাব-ইনেসপেক্টর। এই বাড়ি কমপ্লিট করতে প্রায় কোটি টাকা লেগে যাবে। হয়ত তারও বেশি। চাকরীর বয়সও বেশি না। এত অল্প সময়ে এত টাকার মালিক কি করে হলো? তা অনেকেরই জিজ্ঞাসা। সে যাই হোক। অন্য এক বিবাহিতা মহিলার সাথে তার অন্য রকম সম্পর্ক। এ কথা বলতে গেলেই স্ত্রীর সাথে চরম ঝগড়া ঝাটি হয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে সে তার মোক্ষম অস্ত্রটি নিক্ষেপ করে। তালাকের হুমকি দেয়। আর তখনি বেচারা স্ত্রী চুপ হয়ে যায়। দুটি সন্তান। তাদের কথা ভেবেই হয়ত চুপ করে থাকে বেচারী।
যতো মজবুত করেই সে এই বাড়ি তৈরী করুক-দুর থেকে তাদের যতো সুখী মানুষই মনে হোক না কেন। এই বাড়িতে কিন্তু ‘শান্তি’ বাস করে না। শান্তি এই সংসার থেকে নির্বাসত শুধু পুরুষটির দৌরাত্বে। মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়া এই পুরুষটির অন্তরে আল্লাহর বিধান মেনে চলার কোনো প্রবনতা তো নেই ই, আল্লাহ ভীতি বলতে একটা বিষয় আছে- তাও নেই।
মরা যে লাগবে একথা এরা একদম ভুলে গেছে। ইসলামের ধার তারা একদম ধারে না। নামাজ, রোজা, পর্দা কিচ্ছুনা। শুধু এক জায়গায় মানে ইসলামকে। “ সে ইচ্ছে করলে আরো বিয়ে করতে পারে। ইসলামে একাধিক বিয়ে জায়েজ।”
সে যা ইচ্ছা তাই করবে। স্ত্রী তাকে কিছুই বলতে পারবে না। সে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে স্ত্রীকে যদি সারারাত দাড়িয়ে থাকতে বলে স্ত্রী তাই করবে। এইসব পুরুষদের দৃষ্টিতে এটার নামই ইসলাম।অর্থাৎ তারা অত্যাচার করে ইসলামের নামে।

নারীবাদী পুরুষঃ- এদের মধ্যে একদল আছে আবার নারীবাদী। তারা নারী স্বাধীনতার নামে সোচ্চার। নারীকে রাজমিস্ত্রির যোগাল দেয়া থেকে শুরু করে সর্বত্র পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে অর্থ উপার্জন এবং জীবন ধারন করার উৎসাহ দেয়। আবার এরাই সুযোগ বুঝে এই অরক্ষনীয়া নারীদের চরম সর্বনাশটা করে। নারী তখন সব বোঝে কিন্তু তখন বুঝলেও কিছু করার থাকে না। আর এই কারনে অনেক নারী সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নারী তখন তার সম্মানের আসন থেকে ছিটকে পড়ে। আর সন্তানগুলো হয়ে পড়ে অসহায়। এই নারীবাদী পুরুষেরা কখনও নারীদের বন্ধু নয় বরং এরাই নারীদের সবচেয়ে বড় দুশমন। শুধু নারীদের না= এরা সবার দুশমন।সমাজের এবং মানবতার দুশমন।
সম্মানের সাথে নারীদের ভরন পোষনের দায়িত্ব পুরুষের উপর ন্যাস্ত করেছেন মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা। মাতা ভগ্নী-স্ত্রী ও কন্যার দায় দায়িত্ব পালন করতে পুরুষ বাধ্য। কোনো নারী যদি দরিদ্র স্বামীকে আর্থিক সহযোগিতা করে  তাহলে তা হবে পুরুষের প্রতি নারীর ইহসান। নারীর এই ধরনের সহযোগিতার জন্য দ্বিগুন সওয়াবের সুসংবাদ দিয়েছেন রাসুল সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াস্ সালাম।

আধূনিক জাহেলিয়াতঃ- আমাদের এই জামানাটা আধুনিক জাহেলিয়াতের জামানা। এখন নেশার জন্য শুধু মদ্যপান ই করে না- ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা এমনি আরো কতো নামের কতো ধরনের নেশা দ্রব্য যে আছে। যা আমাদের পুরুষ সমাজকে বিশেষ করে তরুন ও যুব সমাজকে ধ্বংশের অতলে নিয়ে যাচ্ছে। লটারির নামে ঘরে ঘরে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ বিশেষ স্থানে মূর্তী শোভা পাচ্ছে। শ্রদ্ধ নিবেদনের নামে পুজাও চলছে অশালীন পোষাক নারীদের যত্র তত্র ঘোরাফিরা, নারীহত্যা, নারী অপহরন, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা, ভ্রুণ হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আতœসাত, লুন্ঠন, কি নেই- কোন খারাপ কাজ টা নেই আমাদের সমাজে যা প্রাচীন জাহেলিয়াতের জামানায় ছিল? বরং তার চেয়ে অনেক গুন বেশী আছে। আর এর সব গুলোর সাথে জড়িত আমাদের পুরুষেরা। আধুনিক জাহেলিয়াতের থিক থিক পাঁকে পুরুষ আবার ডুবে গেছে। একবার ইসলাম তাকে রক্ষা করেছিল। ইসলামের ছত্রছায়ায় যতদিন ছিল ততদিন সে ছিল সবংশ্রেষ্ঠ মানুষ। ধীরে ধীরে ইসলামের ছায়া তার উপর থেকে সরে গেছে কিংবা সেই সরে গেছে ইসলাম থেকে। আর তখনি তার পথ প্রদর্শক এবং পৃষ্ঠপোষক হয়েছে ইবলিশ। আল্লাহর ভাষায় “সে হলো তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।”
এই প্রকাশ্য দুশমন ইবলিশের একমাত্র লক্ষ্য এবং একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো মানুষের দুনিয়া এবং আখেরাতের ক্ষতি করা। সেই ইবলিশের ধোকায় পরা কোনো অবস্থাতেই মানুষের কাজ হতে পারে না। আল কুরআনের পাতায় পাতায় মুক্তির ঠিকানা। আর তাইতো মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা বলেছেন “পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি  সৃষ্টি করেছেন।”
কুরআন পড়া, হাদিস পড়া সেই সাথে ইতিহাস বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রভৃতি পড়া এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাই পারে মানুষকে উন্নত করতে। এই আধুনিক গোমরাহী এবং অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করতে। সমাজে পুরুষ যদি জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয় ঈমানে আমানে পরিপূর্ন হয়, বিশ্বাস ও সততায় বিশ্বস্ত হয় তাহলে শান্তির সুবাতাস আমাদের বসতভিটায় ফসলের মাঠে,অফিস আদালত, দোকান পাটে- রাষ্ট্র আর সমাজের আনাটে কানাচে বয়ে যাবে অবিরত, অবিরাম। নারীকে ভালো করার জন্য আলাদা কোন আইনের দরকার হবে না। নারী ভালো হয়ে যাবে এমনিতেই।

অপরাধ প্রবনতার মুল রহস্যঃ- অপরাধ প্রবনতার মূল রহস্যই হলো নফস শক্তিশালী হয়ে যাওয়া। মানুষের মধ্যে দুটি শক্তি কাজ করে। একটা ভাল একটা খারাপ। একটা রুহ আর একটি নফস। এই দুটি প্রবনতারই খাদ্য আছে। যাকে যতো বেশি খাদ্য সামগ্রী দেওয়া হয় সে তত বেশী শক্তিশালী হয়। রুহর খাদ্য আমলে সালেহ। আল্লাহ এবং তার রাসুল সা.এর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী তাবৎ ভাল কাজ। যে যত বেশী আলকুরআন এবং হাদিস জানবে এবং মানবে। যে যত বেশী আমলে সালেহ বা ভালো কাজ করবে তার রুহ তত বেশী শক্তিশালী হবে।
আর যে যত বেশী খারাপ কাজ করবে, কুরআন হাদিসের দিকনির্দেশনা অমান্য করবে। তার নফস তত শক্তিশালী। আর নফস যত শক্তিশালী সে তত বেশী অপরাধ প্রবন। সে তখন প্রকাশ্যে খারাপ কথা বলতে, খারাপ কাজ করতে বেশী মজা পায়। তখন তার দর্শন হয় “ হারাম কাজেই আরাম বেশী।’ তাকে বুঝানোর মতো আর কিছু থাকেনা। ইবলিশের সাথে তার আর কোন পার্থক্য থাকে না। সে তখন মানুষ শয়তান হয়ে যায়।
এমনি ‘মানুষ শয়তানে’ ভরপুর এখন আমাদের সমাজ সংসার। পুরুষ নারী নির্বিশেষে এখন নফসের আজ্ঞাবহ দাস হয়ে গেছে। এমন কোনো জঘন্য অপরাধ নেই যা তখন সে করতে পারে না। কারো প্রতি জুলুম করতে সে তখন পিছপা হয় না। সরকারী আইন কিংবা জেল জরিমানা তাকে আর মানুষ করতে পারে না।

আখেরাতের উপর বিশ্বাসঃ- এই ভয়াবহ চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে একমাত্র ইসলামই পারে তাকে রক্ষা করতে। আখেরাতের উপর বিশ্বাসই সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে পারে। আধুনিক জাহেলিয়াত মানুষকে আখেরাতের প্রতি অবিশ্বাসী করে তুলেছে। যার আখেরাতে বিশ্বাস নেই তার তো আল্লাহর কাছে জবাবহিহীর ভয় ও নেই। আর জবাবদিহীতার ভয় না থাকলে মন যা চায় তা করা থেকে সে কেন বিরত থাকবে? আল্লাহর ভয়ই মানুষকে সকল প্রকার সেচ্ছাচারিতা থেকে দুরে রাখে। চারিত্রিক মান উন্নত করে।

পুরুষ হওয়ার অহংকারঃ- আমাদের সমাজের একশ্রেণীর লোক আছে-তারা যে পুরুষ এই নিয়ে তাদের অন্তরে প্রচন্ড অহংকার। তাদের কথায় ও কাজে যখন তখন সে অহংকার প্রকাশ পায়। অথচ সে এক নারীর গর্ভেই জন্ম নিয়েছে। নারীর কোলে লালিত পালিত হয়েছে। নারীর শরীরটা চুষে খেয়েই শরীরটা সুঠাম করেছে........।
সর্বোপরি সে যে পুরুষ এর উপর তার কোনো হাত আছে? এর জন্য কোনো কৃতীত্ব কি তার আছে? আর আল্লাহ তো অহংকারীদের পছন্দ করেন না......।
এক উচ্চশিক্ষিতা মহিলা বিভিন্ন কথা বলতে বলতে স্বামী প্রসঙ্গে কিছু বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে কেঁদে ফেল্লেন। বল্লেন “ আপা ও যে কি পরিমান অহংকারী তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। ও আমাকে মানুষই মনে করে না। আমাকে মাঝে মাঝেই বলে কি জানেন? তুমি যতো বড় মেধাবি আর শিক্ষিতাই হওনা কেন- তুমি যে মেয়ে মানুষ একথা ভুলে যেও না।”
বল্লাম “ একথা ভুলে যাওয়ার কি আছে? তার মাও তো মেয়ে মানুষ....।”
“ মা কেও তেমন একটা সম্মান করে না” বল্লেন ভদ্রমহিলা। একটু চুপ করে থেকে আবার বল্লেন,“নামাজ রোজা করে, হজ্ব করে এসেছে, আল্লাহ পাক ইচ্ছে করলে তাকে জান্নাতবাসী করুক আমার আপত্তি নেই। মহান মালিকের কাছে নিবেদন- তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন। জাহান্নাম থেকে নিস্ক্রতি দেন আর জান্নাতে যেন ওর সাথে জুড়ে না দেন। ওর সাথে আমি জান্নাতেও থাকতে চাই না.....।”

সাহিত্যিক ওয়ায়েজিনদের প্রতিঃ- আমাদের সাহিত্যিকরা নারীদের হিতোপদেশ দিয়ে যতো বইপুস্তক লিখেছেন তার শত ভাগের এর ভাগও যদি স্বজাতির জন্য লিখতেন তাহলে অনেক উপকার হতো। স্ত্রীর সাথে কেমন আচরন করতে হবে? আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সা. পক্ষ থেকে কোন দিক নির্দেশনা আছে কিনা তা অনেক পুরুষই জানেন না। অনেকে তা কুরআন, হাদিস কিছু না জানলেও এই হাদিস (?) টা জানে। “স্বামীর পদতলে স্ত্রীর জান্নাত।” মুকসুদুল মু’মিন বা স্ত্রী শিক্ষার বদৌলতে এমন সব কথা বা শিক্ষা তারা জানে যা কোনো অবস্থাতেই কোরআন হাদিস কিংবা সভ্য মন মানুষিকতার আওতায় পরে না। সাহিত্যিকদের প্রতি নিবেদন- পুরুষদের কিছু উপদেশ দিন। এদের বৃহৎ একটি অংশ কুরআন পড়তেই জানেনা। জানলেও পড়ে না। হাদিস পড়ে না, ইসলাম বোঝে না। সম্প্রতি এক হিন্দুর বাচ্চা আর কুরআনের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছে আর সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুসলিম নামধারী আইনজীবিরা বলেছেন “ আমাদের মধ্যে ভালো কুরআন জানা আইনজীবি নেই আগামী অমুক তারিখে এই বিষয়ে ভালো ভাবে জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” ‘কুরআন জানি না’ একথা বলতে এই মুসলিম নামধারীদের লজ্জা লাগলো না। আমার তো  মনে হয় এদের আর জনসমক্ষে আসা উচিত না।
ওয়ায়েজিনদের কথা আর কি বলব? গ্রামে গঞ্জে এদের ওয়াজের বিষয় বস্তুই হলো স্বামী খেদমতের নামে স্বামী পুজায় উদ্ভুদ্ধ করা। সব চেয়ে মজার কথা কি জানেন? স্ত্রীরা আর ঐসব ওয়াজ শোনে না। শিক্ষিত, অশিক্ষিত সবার ঐ একই অবস্থা। কোথাও কোথাও তো ঐ সব ওয়ায়েজিনদের জব্দও করে গ্রাম্য মহিলারা।
এক ওয়ায়েজিন মেয়েদের পর্দার কথা বলতে যেয়ে বলেছেন, “মেয়ে মানুষের পরিধেয় পোষাক যেনো পর পুরুষে না দেখে। তাহলে কঠিন গুনাহ হয়ে যাবে। মেয়ে মানুষের পুরানা শাড়ি দিয়ে যে কাঁথা সেলাই করে তা পরপুরুয়ের গায়ে দেওয়া উচিত না।”
ওয়াজ শেষে খাওয়া দাওয়া পরে হুজুর ঘুমাতে যেয়ে দেখেন এই শীতের রাতে তার গায়ে দেওয়ার জন্য একটা মাত্র পাতলা চাদরের ব্যবস্থা। ওয়ায়েজিন গৃহমালিক কে ডেকে বল্লেন “ এই প্রচন্ড শীতে এই পাতলা একটা চাদরে কি হবে?”
গৃহমালিক বল্লেন, “ হুজুর আমরা গরীব মানুষ। লেপ, তোষক তো আমাদের নেই। কাঁথা আছে কিন্তু তা তো সবই আমার স্ত্রীর পুরানো শাড়ি দিয়ে সেলাই করা। তা কি ভাবে আপনাকে দেই?”
শ্রদ্ধেয় ওয়ায়েজিনদের কাছে আবেদন পুরুষদের খেদমতে একটু কাজ করেন। তা না হলে রক্ষা পাবেন না। মহিলাদের তুলনায় পুরুষেরা ইসলাম থেকে অনেক দুরে সরে গেছেন। একাধিক বিয়ে এবং নারীর উপর প্রভুত্ব এই দুই জায়গায় তারা ইসলামের দোহাই দেয়। বাস্তব জীবনের আর কোথাও না। আর এই কারনেই আমাদের নতুন প্রজন্ম ইসলাম গ্রহণ করার অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে।
নেক সন্তান সাদকায়ে জারিয়া- অথচ আমাদের ঘরে নেই সন্তান কমই জন্ম নিচ্ছে। ইট তৈরীর ফর্মা বাঁকা হলে যেমন ইট ও বাঁকা হয়- তেমনি মানুষ তৈরী ফর্মা মানে গৃহকর্তাটি বাঁকা হয়ে যাওয়ার কারনে আমাদের সন্তান গুলোও বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মূর্খ হয়ে ইবলিশের হাতের পুতুল হয়ে যাচ্ছে। অনৈসলামিক চিন্তা ধারায় উজ্জিবিত হয়ে ইসলামের বিরোধীতা করছে।
ওয়ায়েজিনদের কাছে আকুল আবেদন আপনারা হাবিজাবি গল্প আর কল্পকাহিনী ইনিয়ে বিনিয়ে না বলে, স্বামী খেদমতের নামে ভুয়া কেচ্ছা কাহিনী না শুনিয়ে আল কুরআন এবং সহীহ হাদিস থেকে কথা বলেন। পুরুষকে আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা ‘কাওয়াম’ বানিয়েছেন। ‘কাওয়ামের’ দায়িত্ব ও কর্তব্য কি তা বুঝিয়ে বলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করতে নিষেধ করেন। তাদের আখেরাতমুখী হওয়ার উপদেশ দেন। মহান আল্লাহ পাক বলেন “ নারীদের জন্যও ঠিক তেমনি ন্যায় সংগত অধিকার আছে যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের উপর। তবে পুরুষদের তাদের উপর একটা মর্যাদা আছে। আর সবার ওপরে আছেন আল্লাহ। সর্বাধিক ক্ষমতা ও কতৃত্বের অধিকারী।” (সুরা বাকারা-২২৮)
মজার ব্যাপার কি জানেন? আমাদের সমাজের অধিকাংশ পুরুষ এই আয়াতের উপরের অংশও জানে না শেষের অংশ ও জানে না কিন্তু মাঝের অংশ টুকু জানে। শুধু জানেই না জোর গলায় প্রচারও করে- “পুরুষদের নারীদের উপর একটা মর্যাদা আছে।” আর এই জানাটা তারা পড়ে জানে না বরং শুনে জানে। এক শ্রেণীর ওয়ায়েজিনদের কাছে।
সেদিন এক ভদ্রমহিলা তার মোবাইল টেলিফোন থেকে আমাকে একটা ওয়াজ শুনাল। অসংখ্য মিথ্যা, যুক্তিহীন, ভিত্তিহীন কথায় ভরপুর তার ওয়াজে। খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা রা. কে পর্যন্ত অপমান অপদস্ত করা হয়েছে তার ওয়াজের মাধ্যমে। আর কোথাকার এক কাঠুরিয়ার স্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠ নারীর মর্যাদা। এইসব তথাকথিত ওয়ায়েজিনদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন শাস্তি।
কুরআনের উপরোক্ত আয়াতখানির প্রথম অংশ-“ নারীদের জন্যও ঠিক তেমনি ন্যায় সংগত অধিকার আছে- যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের উপর।” এই কথাটুকু অনেক পুরুষই জানে না আর অনেকে জানলেও মানে না। এর পরের টুকু জানে “ তবে পুরুষদের তাদের উপর একটা মর্যাদা আছে।” এই কথা আপামর জন সাধারন- শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই জানে।
আবার এই আয়াতের শেষের অংশটুকু “ আর সবার ওপরে আছেন আল্লাহ। সর্বাধিক ক্ষমতা ও কতৃত্বের অধিকারী।” এ কথা ও অনেকে জানে  না এবং মানে না।
এইমাত্র একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং উচ্চস্তরের সরকারী চাকুরীজীবি ভদ্রমহিলা ফোন করে বল্লেন “ আপা আমার স্বামী বোরকা পড়া পছন্দ করে না। আমি পর্দা করে চলতে চাই- কিন্তু স্বামী যদি পছন্দ না করে তাহলে আমর কি করার আছে?”
বলেন তো এই সর্বোচ্চ ডিগ্রী ধারিনীকে আমি কি বলব? যেখানে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন “সবার ওপরে আছেন আল্লাহ। সর্বাধিক ক্ষমতার ও কতৃত্বের অধিকারী।”
আল্লাহর কতৃত্ব, ক্ষমতা, আল্লাহর আদেশ নিষেধের উপর কি কারো পছন্দ অপছন্দের মূল্য আছে?
আহা! আমাদের পুরুয়েরা যদি কুরআন পড়ত। কুরআন জানত আর সেই আলোকেই পথ চলত- তাহলে কতোই না ভালো হতো।
মহান রাব্বুল আলামীন বলেন “তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের দাখিল হও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরন করো না।” আমাদের পুরুষেরা যদি পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামে দাখিল হয়ে যেত-শয়তানের দেখানো পথে না চলত-তাহলে আমাদের সমাজের সব অশান্তি দুর হয়ে যেত।
চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, মদ্যপান, হারাম খাওয়া, অপহরন,ছিনতাই, নারীহত্যা, শিশুহত্যা, ব্যভিচার, অত্যাচার,নির্যাতন, আরো যতো ধরনের খারাবি আছে-সব কিছুতেই নিমজ্জিত ছিল আমাদের পুরুষেরা। একবার ইসলাম তাদের উদ্ধার করেছিল। আবার তারা ডুবতে বসেছে। আমাদের পিতা, ভ্রাতা, জীবনসাথী ও পুত্ররা যেন ইসলামের মধ্যে পরিপূর্ণ ভাবে দাখেল হতে পারে পুরুষদের প্রতি সেই আহবান এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করছি।

হে রাব্বুল আলামীন, আমাদের পুরুষদের তুমি এমন এলেম বা জ্ঞান দাও যাতে তারা সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সব আদেশ এবং উপদেশ যেন নিষ্ঠার সাথে তারা পালন করে সর্ব প্রকারের নিষেধ থেকে তারা যেন নিজেদের হেফাজত করে।
হে আল্লাহ, আমাদের অধিকাংশ পুরুষ ইসলামের সুশীতল ছায়া থেকে দুরে সরে গেছে, হেদায়েতের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে-আধুনিক জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ডুবে গেছে। তাদের তুমি কাওয়াম বা দায়িত্বশীলের মর্যাদা দিয়েছ এবং দিয়েছ কিছু দায়িত্ব। আমাদের সেই কাওয়ামেরা মর্যাদা পাওয়ার ব্যাপারে যতোখানী সচেতন দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে ততোখানী নয়। বরং অনেকের তো দায়িত্ব পালনের অনুভুতিই নেই।
হে রব আমাদের কাওয়ামরে তুমি দায়িত্ব পালনের অনুভুতি দাও। তাদের কে আধুনিক জাহেলিয়াতের অন্ধকার গহবর থেকে উদ্ধার করো প্রভু। তাহলেই শান্তির সুবাতাসে সুবাসিত হবে আমাদের সংসার আমাদের সমাজ।
আমাদের পুরুষ সমাজের বিরাট একটা অংশ নামাজই পড়ে না। অনেকে পড়ে মেয়ে মানুষের মতো ঘরে বসে। মসজিদে যায় না। তাহলে এই কাওয়ামেরা কি করে স্ত্রী পূত্র কন্যাদের নামাজের নির্দেশ কিংবা প্রশিক্ষণ দেবে?
আমার পরিচিত এক বোনের আট বছরের ছেলে একদিন মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে শুনেছে ‘তওবা’ করলে পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তখন বান্দা একদম নিষ্পাপ হয়ে যায়।
সে বাড়ি এসে তার বাবাকে বলছে, বাবা একটু তওবা পড়। বাবা বল্লেন “ কেন তওবা পড়তে হবে কেন?”
ছেলে জিদ করে বল্ল “পড় না একটু” বাবা তওবা পড়ল। ছেলে এইবার খুশি হয়ে বল্ল “বাবা তুমি এখন একদম নিষ্পাপ হয়ে গেছ। আর তোমার কোনো গুনাহ নেই। তুমি আর নামাজ কাজা করবে না। তাহলে আমরা সবাই মিলে জান্নাতে যেতে পারব।” কিন্তু না ছেলেটির বাবা ঠিক মত নামাজি হয় নি। ছেলেটি খুব দুঃখ করে আমাকে বল্ল “জানেন খালামনি, আমি বাবাকে তওবা পড়িয়ে একদম নিষ্পাপ করে দিয়েছিলাম। নামাজ কাজা করতে নিষেধ করলাম বাবা তা শুনল না- আবার নামাজ কাজা করল.....।”
এই ছোট্ট ছেলেটিকে কি বলব আমি? স্ত্রীরা এই সব কাওয়ামদের উপদেশ দিতে গেলে তারা রেগে যায়। তাদের ‘কাওয়াম’ত্বে আঘাত লাগে। সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়ে যায় তখন। তাই হে প্রভু তোমার কাছেই ফরিয়াদ- তুমি এই নাফরমানির থিক থিকে পাঁকে আকণ্ঠ ডুবন্ত পুরুষদের রক্ষা করো প্রভু। জ্ঞানে, মানে, ঈমানে আমলে এদের সমৃদ্ধ করো। তোমার বান্দীদের এই করণ মোনাজাত তুমি কবুল করো।
                                    আমীন। সুম্মা আমীন।

No comments