Breaking News

আমার সিয়াম কবুল হবে কি?



প্রকাশকঃ
আহসান পাবলিকেশন।
---------------------
লেখিকার কথা

রমজান এবং রোযার উপর হাজার হাজার লেখা আছেআর লিখেছেন আমার চেয়ে লক্ষ্যগুণ বেশী ভালো এবং বিজ্ঞ লেখকেরাতাই এই বিষয় নিয়ে আমার লেখার ইচ্ছে ছিলো নাকিন্তু নিম্নোক্ত হাদীসটি আমাকে লিখতে বাধ্য করেছে"তোমাদের সামনে যদি কোনো পাপ বা অন্যায় সংঘটিত হয় তাহলে হাত দিয়ে ঠেকাও। (মানে মতা দিয়ে পাপ কাজটি বন্ধ করে দাও) তা না পারলে মুখে বলোতাও না পারলে মনে মনে ঘৃণা করোএটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর"
সারা মাস রোযার পরে এমনকি রোযার মধ্যেই ঈদের আনন্দের নামে যে পাপের মহড়া চলে তা বন্ধ করার মতা আমার নেই কিন্তু তার বিরুদ্ধে বলতে এবং লিখতে তো পারিসে তৌফিক তো আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা আমাকে দিয়েছেন
আর লেখাটা শেষ হওয়ার পর মনে হয়েছে মহান রমজান ও রোযা সম্পর্কে যারা যুগে যুগে লিখেছেন সেই সব মুজাহিদদের মিছিল তো অনেক বড়আমি যত ক্ষুদ্র আর তুচ্ছ হই না কেন, থাক না আমার নামটাও সেই মিছিলে
আমি লিখেছি আমার ক্ষুদ্র ইলম আর আমার আবেগ থেকে এর মধ্যে ত্রুটি বিচ্যুতি কিছু থাকতেই পারেবিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টিতে ধরা পড়লে মা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করিআল্লাহ পাক যেন তাঁর এই নগণ্য বান্দীর দোষত্রুটি মার্জনা করে কবুল করে নেনআমীনছুম্মা আমীন

                                      মাসুদা সুলতানা রুমী


প্রতি বছর মাহে রমজান আসে আবার চলেও যায় অতিদ্রুতকুল মুসলিমিন এক মাস সিয়াম সাধনা করে ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথেযা পাওয়ার ছিলো তা পায় কিনা জানি নাএই এক মাস সেমিনার, সাধারণ সভা, ইফতার মাহফিল, রমজানের আলোচনা, বিভিন্ন নামে রমজানের বিভিন্ন দিক নিয়ে অগণিত আলোচনা এবং প্রবন্ধ পাঠ করা হয়পত্র পত্রিকায় লেখা হয় রমজান ও রোযা সম্পর্কে অসংখ্য লেখাছোট বড় কত যে বই লিখেছেন বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ তা হিসাব করা কঠিনএই এক মাস কতভাবে কত আঙ্গিকে যে রমজানের চর্চা হয় অথচ পরবর্তী এগার মাসে তার প্রভাব কি থাকে আমাদের ব্যক্তি এবং জাতীয় চরিত্রে ?

জানি উত্তর নেতিবাচক হবেকিন্তু কেন?
এর উত্তরে অনেকেই বলবেন হয়ত আমাদের রোযা কবুল
হয় না
কিন্তু কেন কবুল হয় না?
এর উত্তরে হয়ত কেউ বলবেন "আল্লাহর ইচ্ছা"
সত্যি কি তাই? বান্দা কষ্ট করে রোযা রাখবে আর আল্লাহ্ বিনা কারণে কবুল করবেন না তা কি হয় ?
হয় নাকনো হয় না
মহান আল্লাহ্  কেনো তাঁর বান্দার উপর জুলুম করেন না
আমাদের রোযা কবুল হয় না আমাদের দোষেআমাদের কর্মফলেপ্রতিটি কাজেরই তো একটা উদ্দেশ্য আছেউদ্দেশ্য ছাড়া কি কাজ হয়?
চাকরী করি, ব্যবসা করি, এমন আর্থিক সচ্ছলতা প্রাপ্তির জন্য যাতে জীবন ধারণের উপকরণসমূহ সহজে পাওয়া যায়পায়ে হাঁটি, গাড়িতে চড়ি Ñ নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্যরান্না করি খাওয়ার জন্য
এমনকি কেউ আছে যে চাকরী করে কিন্তু বেতনের আশা করে নাব্যবসা করে- লাভ চায় নাকোনো গন্তব্যস্থল নেই এমনিই গাড়িতে চড়েরান্না করে ফেলে দেয়, খায় নাএমন কোনো মানুষ কি খুঁজে পাওয়া যাবে? আসলে মানুষের প্রত্যেকটা কাজের পেছনেই উদ্দেশ্য আছে
চাকরী কিংবা ব্যবসা করে যদি সচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারি তাহলে আমার চাকরী করা কিংবা ব্যবসা করা সফলগাড়িতে চড়ে আমার নির্দিষ্ট স্থানে যদি যেতে পারি তাহলে আমার জার্নি করা সফলতেমনি যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের জন্য এক মাস সিয়াম বা রোযা ফরয করেছেন সেই উদ্দেশ্য বা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেই সিয়াম সাধনা বা রোযা পালন সফল হবেরোযা কবুল হবে
একটু ভালো করে দেখলেই বোঝা যাবেÑ রমজানের এক মাসের যে কর্মসূচী আল্লাহ্ গ্রহণ করেছেন তা হলো ভালো মানুষ তৈরীর কর্মসূচী
আর রাসূল (সা.) সেই কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়ে গেছেনআমরাও যদি রাসূল (সা.)-এর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী রমজান মাসে চলি, বলি এবং কাজ করি তাহলে আমার দৃঢ বিশ্বাস আমাদের রোযাও দয়াময় প্রেমময় রহমানুর রহিম কবুল করে নেবেন
মহান আল্লাহর ভাষায়
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -
"তোমাদের প্রতি সিয়াম ফরয করা হয়েছেতোমাদের পূর্ববর্তী বান্দাদের উপরও ফরয করা হয়েছিল সম্ভবত তোমরা মুত্তাকি হতে পারবে" (সূরা বাকারা :১৮৩)
অর্থা আমরা যাতে মুত্তাকি হতে পারি এই জন্যই আল্লাহ্ পাক আমাদের উপর সিয়াম ফরয করেছেনতাহলে হিসাব তো অতি সহজ, যদি মুত্তাকি হতে পারি তো রোযা কবুল হয়েছে আর যদি মুত্তাকি হতে না পারি তাহলে রোযা কবুল হয়নি
আমরা সবাই জানি মুত্তাকি মানে আল্লাহর ভয়ে ভীত ব্যক্তিআসলে এই কথাটি পুরাপুরি ঠিক হলো নাউপন্যাসিক শর চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন "ভুত আর ভগবান আমার কাছে একই রকমভুতকে না দেখে ভয় পাই, ভগবানকেও না দেখে ভয় পাই"
মহান আল্লাহর প্রতি মু'মিন মুসলমানের ভয় ভুত বা ভগবানকে ভয় করার মতো নয়আল্লাহর প্রতি মু'মিন বান্দার অন্তরে যেমন ভয় থাকবে, তেমনি থাকবে ভালোবাসাএই ভীতি এবং প্রীতি যে বান্দার অন্তরে থাকবে তার নাম মুত্তাকিআল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন চান এই এক মাস সিয়াম পালনের মাধ্যমে বান্দা তার প্রতি ভালোবাসা মিশ্রিত ভয় কিংবা ভয় মিশ্রিত ভালোবাসা পোষণ করুক এবং খাটি খলিফাতুল্লাহ হয়ে উঠুক

রাসূল (সা.) বাস্তব কুরআন-এর প্রতিচ্ছবি
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আল কুরআনে যা কিছু বলেছেন রাসূল (সা.) সেই কাজটি বাস্তবে করে দেখিয়েছেনমুত্তাকির পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ্ সূরা বাকারার ২নং আয়াতে বলেছেনÑ
১. তারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে
২. সালাত কায়েম করবে
৩. আল্লাহর দেয়া রিয্ক থেকে খরচ করবে
৪. শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি বিশ্বাস করবে
৫. পূর্ববর্তী কিতাবের প্রতিও বিশ্বাস করবে এবং আখেরাতের প্রতি থাকবে দৃঢ় বিশ্বাস
এই সূরা বাকারার ১১৭ নং আয়াতে মুত্তাকির বিস্তারিত গুণাবলী বর্ণনা দেয়া হয়েছে
বলা হয়েছে মুত্তাকিরাÑ
১.   আল্লাহ্, আখেরাত, ফেরেশ্তা, কিতাব এবং নবী রাসূলদের প্রতি যথাযথভাবে বিশ্বাস স্থাপন করবে
২.   আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার তাগিদে নিকট আত্মীয়, গরীব দুঃখীদের সাহায্য করবে
৩.   সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে
৪.   ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে এবং
৫.   সবর করবে
উপরোক্ত প্রতিটি কাজ রাসূল (সা.) করেছেন এবং সাহাবীদের ও পরবর্তী উম্মতদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন কিভাবে কাজগুলো করতে হবেআর এই রমজান মাসে কিভাবে ঐ সব গুণাবলী অর্জন করা যায় তাও দেখিয়েছেন, শিখিয়েছেন
১. হযরত সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : নবী করীম (সা.) শাবান মাসের শেষ দিন আমাদের সম্বোধন করে ভাষণ দেন
তাতে তিনি বলেন, "হে জনগণ! এক মহা পবিত্র ও বরকতের মাস তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করেছেএ মাসের একটি রাত বরকত, ফযীলত ও মর্যাদার দিক দিয়ে সহস্র মাস অপো উত্তমএ মাসের রোযা আল্লাহ্ তায়ালা ফরয করেছেনযে লোক এ মাসে আল্লাহর সন্তোষ ও তার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কোনো সুন্নত বা নফল ইবাদত করবে তাকে অন্যান্য সময়ের ফরয ইবাদতের সমান সওয়াব দেয়া হবেআর যে লোক এ মাসে একটি ফরয ইবাদত করবে সে অন্য সময়ের সত্তরটি ফরয ইবাদতের সওয়াব পাবে।"
এটি সবর, ধৈর্য ও তিতিক্ষার মাসআর সবরের প্রতিফল আল্লাহর নিকট পাওয়া যাবে জান্নাতরূপে
এ হচ্ছে পরস্পর সহৃদয়তা ও সৌজন্য প্রদর্শনের মাসএ মাসে মু'মিনের রিযিক প্রশস্ত করে দেয়া হয়
এ মাসে যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, তার ফলস্বরূপ তাকে মাফ করে দেয়া হবে ও জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি দেয়া হবে
আর তাকে আসল রোযাদারের সমপরিমাণ সওয়াব দেয়া হবে
এতে আসল রোযাদারের সওয়াব কম করা হবে না
আমরা নিবেদন করলামÑ  "হে আল্লাহর রাসূল আমাদের মধ্যে অনেকেই রোযাদারকে ইফতার করাবার সমর্থ রাখে না। (এ দরিদ্র লোকেরা কিভাবে সওয়াব পেতে পারে?) যে লোক রোযাদারকে একটা খেজুর বা দুধ বা এক গ্লাস সাদা পানি দ্বারাও ইফতার করাবে তাকেও আল্লাহ তায়ালা একই সওয়াব দান করবেনআর যে লোক একজন রোযাদারকে পূর্ণমাত্রায় পরিতৃপ্ত করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে আমার 'হাউজ' হতে এমন পানীয় পান করাবেন যাতে জান্নাতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত সে পিপাসার্ত হবে না"
এটি এমন এক মাস যে, এর প্রথম দশ দিন রহমতের বারিধারায় পরিপূর্ণদ্বিতীয় দশ দিন মা ও মার্জনার জন্য ও শেষ দশ দিন জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তি লাভের উপায়
আর যে লোক এ মাসে নিজের অধীন লোকদের শ্রম-মেহনত হ্রাস করে দেবে আল্লাহ্ তাকে মা করে দেবেন এবং তাকে দোযখ থেকে নিষ্কৃতি দেবেন। (বায়হাকী, শুয়াবিল ঈমান)
২. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন : "আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক আমলের সওয়াব দশ গুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়কিন্তু রোযা এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম।" আল্লাহ রাব্বুল 'আলামিন বলেন "রোযা একান্তভাবে আমারই জন্যআমিই তার প্রতিফল দেবোরোযা পালনে আমার বান্দাহ আমারই সন্তোষ লাভের জন্য স্বীয় ইচ্ছা, বাসনা ও পানাহার বন্ধ রাখে"
"রোযাদারের জন্য দু'টি আনন্দএকটি ইফতার করার সময় ও দ্বিতীয়টি তার মালিক আল্লাহর সাথে সাক্ষা লাভের সময় পাবেরোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্কের সুগন্ধি থেকেও উত্তম"
"আর রোযা ঢালস্বরূপতোমাদের একজন যখন রোযা রাখে তখন সে যেন বেহুদা ও অশ্লীল কথা না বলে এবং চিকার ও হট্টগোল না করেঅন্য কেউ যদি তাকে গালাগাল করে কিংবা তার সাথে ঝগড়া বিবাদ করতে আসে, তখন সে যেন বলে আমি রোযাদার" (সহীহ বুখারী)
৩. আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রমজান মাস শুরু হলে রাসূল (সা.) বলেন, "তোমাদের নিকট এই মাস সমুপস্থিতএতে রয়েছে এমন এক রাত যা হাজার মাস অপো উত্তমএ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হলো সে সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। (সহীহ বুখারী)
৪. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : "রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে লোক মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ পরিত্যাগ করতে পারলো না তার খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নাই" (সহীহ বুখারী)
৫. রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় ঈমানসহ রমজানের রোযা রাখবে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে
রমজান ও রোযা সম্পর্কিত আরও অনেক হাদীস আছেউপরে বর্ণিত এই পাঁচটি হাদীস থেকে আমরা রমজানের শিক্ষা কি? কিভাবে তা কাজে পরিণত করতে হবে তা উপলব্ধি করতে পারবো
এই হাদীস কয়টি বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায় তা হলো: প্রথম হাদীসটিতে পাইÑ
১.   হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাতঅর্থা হাজার মাসের চেয়ে বেশী ইবাদত করলে যে সওয়াব হবে সেই সওয়াব এক রাতে ইবাদত করলে পাওয়া যাবে যে রাতে, সেই রাত আছে এই মাসে
২.   এ মাসের রোযাকে আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় (ফরয) করা হয়েছে
৩.   এ মাসের একটি সুন্নত বা নফল অন্য মাসের ফরযের সমতুল্য
৪.   এ মাসের একটি ফরয অন্য মাসের সত্তরটি ফরযের সমতুল্য
৫.   এ মাস সবর, ধৈর্য ও তিতিক্ষার মাসসবরের প্রতিফল জান্নাত
৬. পরস্পর সহৃদয়তা ও সৌজন্য প্রদর্শনের মাস
৭.   এ মাসে রিয্ক প্রশস্ত করে দেয়া হয়
৮. এ মাসে কোনো রোযাদারকে শুধু পানি দিয়ে ইফতার করালেও রোযাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়
৯.   এ মাসে যে রোযাদারকে পূর্ণ মাত্রায় আহার করাবে আল্লাহ্ তাকে হাউজে কাওসার থেকে এমন পানীয় পান করাবেন যার ফলে জান্নাতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত সে পিপাসার্ত হবে না
১০.  এ মাসের প্রথম দশ দিন রহমতের, দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাতের ও তৃতীয় দশ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের
১১.  এ মাসে অধীনস্থ লোকদের শ্রম-মেহনত হাল্কা করে দিলে আল্লাহ্ তাকে মা করবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন

দ্বিতীয় হাদীসে পাইÑ
১.   আদম সন্তানের অন্যান্য ভালো কাজের সওয়াব দশ গুণ হতে সাত'শ গুণ বৃদ্ধি করা হয় কিন্তু রোযার সওয়াব ভিন্ন রকমঅগণিত অসংখ্য সওয়াব আল্লাহ্ তার ইচ্ছামত বান্দাকে দান করবেন
২.   রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে অসম্ভব পছন্দনীয়
৩.   রোযা ঢালস্বরূপঅর্থা ঢাল যেমন মানুষকে শত্রুর আঘাত থেকে রা করে রোযাও মানুষকে ইবলিসের আক্রমণ থেকে রা করেরোযাদার মানুষকে দিয়ে ইবলিস খারাপ কাজ করাতে পারে না
৪.   রোযা রেখে যেন কেউ ফাহেশা ও অশ্লীল কথা না বলে
৫.   অন্য কেউ ঝগড়া করতে আসলে কিংবা গালমন্দ করলেও সে যেন তাতে প্তি না হয়বরং সে যেন বলে "আমি রোযাদার

তৃতীয় হাদীস থেকে পাইÑ
এতো সওয়াব এতো নিয়ামতের মাস থেকে যে বঞ্চিত হয় সে সত্যিকারের-ই হতভাগা

চতুর্থ হাদীসে বলা হয়েছেÑ
রোযা রেখে যদি কেউ মিথ্যা কথা আর খারাপ কাজ করে, আল্লাহ্ তার রোযা গ্রহণ করবেন নাখামাখা না খেয়ে থাকার কষ্ট ছাড়া সে আর কিছুই পাবে না

পঞ্চম হাদীসে বলা হয়েছেÑ
ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রোযা পালন করলে তার পেছনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবেঅর্থা এক মাস রোযা পালনের পর শাওয়াল মাস থেকে সে একেবারেই গুনাহ মুক্ত নিষ্পাপ এক বান্দা
উপরোক্ত হাদীসগুলো বিশ্লেষণ করে যা পাওয়া গেলো তা কি আল কুরআনে আল্লাহ্ মুত্তাকিদের যে গুণাবলী বর্ণনা করেছেন তারই ব্যাখ্যা নয়?
প্রত্যেক রমজানে আল্লাহ্ পাক এসব গুণাবলী অর্জনের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছেনকোনো মানুষ যদি ষাট বছর বাঁচে, সে তো প্রায় পঞ্চাশ বার ট্রেনিং দেয় এসব ভালো গুণাবলী অর্জনেরতারপরও যদি সেসব গুণাবলী বান্দা অর্জন করতে না পারে তাহলে এতোগুলো ট্রেনিং সবই কি বিফলে যাবে না?
একবার জিবরীল (আ) বললেন, "যে ব্যক্তি রমজানের রোযা পেলো কিন্তু নিজেকে পাপমুক্ত করতে পারলো না, তার উপর আল্লাহর লা'নততখন রাসূল (সা.) বললেন 'আমীন'"
এক মাস রোযা রেখেও যাদের রোযা কবুল হলো না, মানে যেসব গুণাবলী অর্জন করার কথা ছিলো তা অর্জন হলো নাÑ জিবরীল (আ.) প্রস্তাব করলেন তাদের প্রতি আল্লাহর লা'নত হোক
আর রাসূল (সা.) আমীন বলে প্রস্তাবটা পাশ করায়ে নিলেনসে যত দিন বাঁচবে আল্লাহর লা'নত নিয়েই বাঁচবেযদি পরবর্তী বছরের রোযা কবুল করাতে পারে তো ভিন্ন কথা
উপরোক্ত কুরআনের আয়াত এবং হাদীসগুলোর আলোকে বোঝা যায়Ñ রোযা কবুল হয়েছে কি হয়নি তা বোঝার জন্য মৃত্যু পর্যন্ত অপক্ষা করার প্রয়োজন নেইএখনই যাচাই করে দেখা যেতে পারেআর মৃত্যুর পর যদি দেখেন রোযা কবুল হয়নি তাহলে তখন জেনে আর লাভ কি?
জানতে হবে তো এখনএ বছর কবুল না হলে আগামীতে কবুলের প্রচেষ্টা নিতে হবে
অবশ্য সে সময় পাওয়া যাবে কিনা তাও আল্লাহ্ই ভালো জানেনআসলে সময়ক্ষেপণ না করে এই মুহূর্ত থেকে কুরআন এবং হাদীসে বর্ণিত গুণাবলী যা আমাদের চরিত্রে নেই তা অর্জন করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে
রোযার মাসে জ্বীন শয়তানকে বন্দী করা হলেও নফস তো আমাদের ভেতরেইতাকে তো আর বন্দী করা হয়নি
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে দু'টি সত্তা আছে, একটি রূহ আর একটি নফসএই দু'টি সত্তারই খাদ্য আছে
একটি রাষ্ট্রে প্রধান শাসনকর্তার মর্যাদা যেমন, মানুষের গোটা সত্তায় রূহের মর্যাদা তেমনিনফস তার কামনা বাসনার কথা রূহের কাছে পেশ করতে পারে কিছু করার মতা তার নেই
সে আবেদন মঞ্জুর হবে কিনা সেই সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার একমাত্র রূহ'
কিন্তু খাদ্যের অভাবে কারো রূহ যদি দুর্বল হয়ে যায় আর অতিরিক্ত খাদ্য পেয়ে কারো নফস যদি শক্তিশালী হয়ে রূহ'র উপর মালিক হয়ে বসে, তখন যে কোনো খারাপ কাজ করতে নফসের আর বাধা থাকে না
এই রোযার মাসে যেসব গুণাবলী অর্জন করতে বলা হয়েছে, যা কিছু ভালো কাজ করতে বলা হয়েছেসেসব হলো রূহ'র খাদ্য
আর নিজে শান্তিতে থাকা, ভালো খাওয়ার জন্য যা কিছু খারাপ কাজ, খারাপ কথা, হালাল হারাম বাছ-বিচার না করা, আল্লাহর নাফরমানী করাÑ এসব হলো নফসের খাদ্য
রূহ'র খাদ্য বেশী দিতে পারলে রূহ শক্তিশালী হবেআর নফসের খাদ্য বেশী দিলে নফস শক্তিশালী হবেÑ এটাই স্বাভাবিক
রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ে অধীনস্থরা শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রে যে বিপর্যয় দেখা দেয় তা ঠেকানোর মতা আর রাষ্ট্রপ্রধানের থাকে না
১৯৬৯/৭০ সালের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানবাংলাদেশের আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা ভালোবেসেছে তাকে
তার মুখের কথায় জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে কিন্তু পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে অধীনস্থদের উপর শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেননিতার অধীনস্থরাই তার চেয়ে বেশী শক্তিশালী হয়ে পড়েছিল
কাউকে শাসন করতে না পেরে, কারো খারাপ কাজে বাধা দিতে না পেরে আফসোস করে বলেছেন "সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি"
আবার কখনো বলেছেন "সাড়ে নয় কোটি কম্বল আনলাম বিদেশ থেকেআমার কম্বলটা কই?"
আর তার অধীনস্থরা রিলিফের টাকা চুরি করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ নয় তাল গাছ হয়েছেদেশে দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভিক্ষ, চরম দুরাবস্থাএর জন্য রাষ্ট্রপ্রধানকে দিতে হয়েছে চরম মূল্যনিজের এবং পরিবারের জীবন দিয়ে খেসারত দিতে হয়েছে
ঠিক তেমনি দেহ রাষ্ট্রের প্রধান 'রূহ্' যদি দুর্বল হয়ে পড়ে আর নফস হয়ে পড়ে শক্তিশালী তাহলে আর কিছু করার থাকে নাজাহান্নামের দোরগোড়া পর্যন্ত নিয়ে ছাড়ে
মালেক ইবনে দীনার ছিলেন তকালীন ইরাকে বিখ্যাত আলেমতার জনসভায় উপস্থিতি দেখে মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে যেতেন বাগদাদের বিলাসী এবং অত্যাচারী তথাকথিত খলিফারাএকবার লোকে লোকারণ্য এক মাহফিলে বক্তৃতা দেয়ার জন্য দাঁড়াতেই এক শ্রোতা দাঁড়িয়ে বললেন, "আপনার বক্তৃতার আগে আমার একটি প্রশ্নের জবাব দিন"
'কি প্রশ্ন আপনার?' জানতে চাইলেন মালিক বিন দীনার
বয়স্ক শ্রোতা ভদ্র লোক বললেন "প্রায় বছর দশেক আগে বাগদাদের এক শুরীখানায় এক ব্যক্তিকে মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি, আপনি তো সেই ব্যক্তিআমাকে বলুন কিভাবে আপনি শুরীখানা থেকে এখানে এলেন?"
মালিক বিন দীনার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেনকিছুক্ষণ পর বললেন, "হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেনআমি সেই ব্যক্তিশুরীখানা থেকে এখানে আসার কাহিনীটা-ই আজ আপনাদের শুনাবো।"
আপনারা তো সবাই শুনলেন আমি আকণ্ঠ মদে মাতাল এক ব্যক্তি ছিলামএক কদরের রাতে মদের দোকান বন্ধ ছিলোআমি দোকানদারকে অনেক অনুরোধ করে এক বোতল মদ কিনলাম বাড়িতে বসে খাবো এই শর্তে
মুসল্লিরা যাতে না দেখে বোতলটি লুকিয়ে নিয়ে আমি বাড়ি ঢুকলামঢুকতেই দেখি আমার স্ত্রী লাইলাতুল কদরের নামায পড়ছেআমি পাশ কেটে আমার ঘরে চলে গেলামবোতলটা বের করে টেবিলের উপর রাখলামএমন সময় আমার তিন বছরের মেয়েটি দৌড়ে এলো আমার কাছেটেবিলের সাথে ধাক্কা খেলো আর সাথে সাথে মদের বোতলটি মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে গেলোমেজাযটা অসম্ভব খারাপ হলেও করার কিছু থাকলো নাঅবুঝ মেয়েটি খিল খিল করে হাসতে লাগলো
ভাঙ্গা বোতল জানালা দিয়ে ফেলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লামসে রাতে আর মদ খাওয়া হলো না আমারআবার যথারীতি বছর গেলোলাইলাতুল কদর এলোআমি এক বোতল মদ নিয়ে বাড়ি এলামকারণ এই রাতে মদের দোকান বন্ধ থাকেআজও দেখলাম আমার স্ত্রী নামায পড়ছে। সিজদায় গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে
আমি আল্লাহর বান্দীকে কান্নার সুযোগ দিয়ে আমার ঘরে চলে এলাম বোতলটা টেবিলের উপর রেখে কাপড় চোপড় বদল করলামমদের বোতলের দিকে তাকাতেই আমার তোলপাড় করে কান্না এলো
তিন মাস হলো আমার শিশু কন্যাটি মারা গেছে
হ্যাঁ, যার ধাক্কায় গত বছর মদের বোতলটি ভেঙ্গে গিয়েছিলবোতলটা ধরে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম
স্বপ্নে দেখছি বিরাট একটা সাপ আমাকে তাড়া করছে
আমি ভয়ে দৌড়াচ্ছিসাপও দৌড়াচ্ছেপেছনে একবার তাকিয়ে তো বেহুঁশ হবার উপক্রমএতো বড় আর এতো মোটা সাপ আমি জীবনে দেখিনি
এমন সময় পাশেই দুর্বল এক বৃদ্ধকে দেখলাম
বৃদ্ধ ম্লান হেসে বলল, "বাবা আমি খুব দুর্বল এবং ক্ষুধার্ত আর এই সাপ অসম্ভব শক্তিশালী আমি এ সাপের সাথে পারবো নাতুমি এই পাহাড়ের উপরে উঠে ডান দিকে যাও বলে একটি পাহাড় দেখিয়ে দিলো।"
আমি অনেক কষ্টে পাহাড়ে উঠেই দেখি পাহাড়ের ওপাশে দাউ দাউ করে জাহান্নামের আগুন জ্বলছেআর পেছনেই হা করে এগিয়ে আসছে বিরাট আজদাহা সজগর সাপ
বৃদ্ধের কথা মতো ডান দিকে ছুটলাম
দেখছি খুব সুন্দর একটি বাগানছোট ছোট বাচ্চারা খেলছেগেটে দারোয়ান
দারোয়ান চিকার করে উঠল, "এই বাচ্চারা দেখতো এই লোকটি কে? সাপটাতো একে খেয়ে ফেলবে নয়তো জাহান্নামে ফেলে দেবে।"
দারোয়ানের কথা শুনে বাচ্চারা দৌড়ে এলো
তার মধ্যে আমার মেয়েটাও আছে
আমার মেয়েটা ডান হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বাম হাতে সাপের মুখের উপর থাপ্পর মারলো
সাপটা আগুনের মধ্যে নেমে গেলো
আমি অবাক হয়ে বললাম, "মা তুমি ছোট্ট একটা মেয়ে আর অত বড় সাপ তোমাকে ভয় পায়।"
মেয়েটি বললো, "আমরা জান্নাতি মেয়ে তোজাহান্নামের সাপ আমাদের ভয় পায়বাবা ঐ সাপটাকে তুমি চিনতে পেরেছো?"
বললাম "না-মা"
ওতো তোমার নফস
"নফসকে এতো বেশি বেশি খাবার দিয়েছো যে সে অত বড় আর শক্তিশালী হয়েছেসে তোমাকে জাহান্নাম পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে"
বললাম, রাস্তায় এক দুর্বল বৃদ্ধের সাথে দেখা হয়েছিলসে তোমার এখানে আসার রাস্তা বাতলে দিয়েছে
সে কে?
মেয়েটি বললো, "তাকেও চিনতে পারোনি? সে তো তোমার রূহতাকে তো কোনো দিন খেতে দাওনিনা খেয়ে খেয়ে দুর্বল হয়ে কোনো মতে বেঁচে আছে"
মনে হলো তাইতোবৃদ্ধ বলছিলো, "আমি খুবই দুর্বল আর ক্ষুধার্ত এই শক্তিশালী সাপের সাথে আমি পারি না"
ঘুম ভেঙ্গে গেলো
একটু চুপ করে থেকে মালেক বিন দীনার আবার বলতে লাগলেন"সেই দিন থেকে আমার রূহকে আমি খাদ্য দিয়ে যাচ্ছি আর নফসের খোরাক একদম বন্ধ করে দিয়েছিআমি আজও চোখ বন্ধ করলেই আমার নফসের ভয়াল রূপ দেখতে পাই আর দেখতে পাই আমার রূহকে আহা! কতো দুর্বল, হাঁটতে পারে না।"
ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন মালেক বিন দীনার
আমাদের অধিকাংশ রোযাদারের নফসই মোটাতাজা হয়ে গেছে আর রূহ্ হয়ে গেছে দুর্বল
তা না হলে কেন আমাদের দেশে এতো অন্যায়, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘুষ, অশ্লীলতাকেন এতো জালিয়াতী, মিথ্যা মামলা মোকদ্দমাএতো ভেজাল-মজুদদারী, মুনাফাখোরি, এতো ব্যভিচার-অপহরণ-খুন খারাবি?
আমাদের নফস খুবই শক্তিশালী হয়ে গেছে
রূহ্ আর পারে না নফসের সাথে
এই রমজানের একটি মাস নফসের খাদ্য একদম বন্ধ করে দিয়ে রূহ'র খাদ্য বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা নিয়েছেন আল্লাহ্ পাকআমরা যদি সেই কর্মসূচী অনুযায়ী নফকে দুর্বল আর রূহকে শক্তিশালী করতে পারি তাহলেই বাকি এগার মাস খাঁটি মুত্তাকি হয়ে জীবন যাপন করতে পারবো
আমাদের নফস দুর্বল না শক্তিশালী তা এখনই পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে
মনে করেন এই মুহূর্তে ঘরে আপনি একা আছেনটি.ভি-তে সুন্দর একটা সিনেমা হচ্ছেআপনার মনে হবে, না- রোযা রমজানের দিনএসব দেখে সময় নষ্ট করার মানে নেই
পর মুহূর্তে মনে হবে, কি হবে একটু দেখলে? সিনেমাটা খারাপ নাতাছাড়া আমি যে সিনেমা দেখছি তাতো আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না....
দেখা হয়ে যাওয়ার পর আবার মনে হবে কেন যে ঐসব ছাইভস্ম দেখতে গেলামখামাখা সময় নষ্ট
এ ক্ষেত্রে আপনার নফসই শক্তিশালীআপনার দুর্বল রূহ্ মিনমিন করে একটু বাধা দিয়েছিল কিন্তু নফসের সাথে পারেনি
রাসূল (সা.) বলেছেন, "অনেক রোযাদার এমন আছে কেবল ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া তার ভাগ্যে আর কিছুই জোটে নাতেমনি রাত্রিতে ইবাদতকারী অনেক মানুষ আছে যারা রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারে না"
আর একটি হাদীসÑ "যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করবে না তার খানাপিনা পরিত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নাই"
এই দু'টি হাদীসের অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট ক্ষুধার্ত কিংবা পিপাসার্ত থাকা ইবাদত নয়
আল্লাহ যে মানের মানুষ চান এই রোযার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে সেই মানে পৌঁছাতে পারলেই রোযা কবুল হবে
নয় তো নাআর রোযা কবুল না হলে জাহান্নামের আগুন ছাড়া কি উপায় আছে ?
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আমাদের দোয়া শিখিয়েছেন, "রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আখেরাতে হাসানাতাঁও ওয়া কিনা আযাবান্নার"
"হে রব, আমাদের দুনিয়ায় শান্তি দাও এবং আখেরাতেও শান্তি দাওআর জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের বাঁচাও"
দুনিয়ার শান্তি আর আখেরাতের শান্তি পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িতযে ব্যক্তি দুনিয়ায় শান্তিতে থাকবে সে আখেরাতেও শান্তিতে থাকবেযে পরিবার দুনিয়ায় শান্তিতে থাকবে সে পরিবার আখেরাতেও শান্তিতে থাকবেযে সমাজ দুনিয়ায় শান্তিতে থাকবে সে সমাজ আখেরাতেও শান্তিতে থাকবে
কারণ মুত্তাকির যা গুণাবলী "পরিবার আর সমাজে যদি সেই গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ বসবাস করে তাহলে সেই পরিবারে সেই সমাজে তো শান্তি না এসে পারে না"

আল্লাহর ভয়ে ভীত ব্যক্তির নমুনা
খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর যামানাএক ঈদের দিনমদীনার সবাই আনন্দে আত্মহারানামাযের সময় হয়ে গেছে কিন্তু খলিফা ওমর দরজা বন্ধ করে অঝোরে কাঁদছেন
সবাই জিজ্ঞেস করছে, আজ ঈদের দিন খুশির দিনখলিফা কেন কাঁদছেন? উত্তরে খলিফা বললেন, "কি করে আজ আমি খুশি হবো- এখনও তো জানতে পারিনি আমার রোযা কবুল হয়েছে কিনা?" তাঁর মধ্যে ছিলো জবাবদিহিতার ভয়রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি সামান্য ত্রুটি হয়ে যায় সেই ভয়
প্রত্যেক মানুষকেই কোনো না কোনো দায়িত্ব দেয়া হয়েছেসেসব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারলে যে আল্লাহর কাছে পাকড়াও হতে হবেÑ এই ভীতির নামই তো তাকওয়া
রমজানের রোযা মানুষের মধ্যে এই দায়িত্বানুভূতি সৃষ্টি করবেÑ এটাই আল্লাহ পাক চান
আর এই দায়িত্বানুভূতি যদি আমাদের মধ্যে জাগ্রত হতো তাহলে আমাদের সমাজে কল্যাণের স্রোত বয়ে যেতো
- পুণ্যের সুবাতাসে মুখরিত হতো আমাদের আঙ্গিনা
অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা নির্বাসিত হতো আমাদের সমাজ থেকে
জানি না কবে আমরা মুত্তাকি হতে পারবো?

মুত্তাকি বা তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তি
১.   আল কুরআন বেশী বেশী করে পড়বে, জানবে এবং পরিপূর্ণভাবে মানবে
২.   আখেরাতকে সামনে রেখেই সে প্রতিটি কাজ করবে
৩.   আত্মীয়তার হক যথাযথভাবে আদায় করবে
৪.   গরীব দুঃখীদের খোঁজ নেবে, সাহায্য করবে
৫.   সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে
৬. ওয়াদা এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে
আল্লাহর কাছে যা কিছু ওয়াদা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তাও পূরণ করবে, মানুষের সাথে কোনো ওয়াদা, প্রতিশ্রুতি করে থাকলে তাও আদায় করবেরূহানী জগতে আল্লাহ পাক আমাদের কাছ থেকে একটা প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেনবলেছিলেন 'আমি কি তোমাদের প্রভু নই?' সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম "হ্যা তুমিই আমাদের রবÑ আমাদের প্রভু" প্রতি ওয়াক্ত নামাযের প্রত্যেক রাকাতে-রাকাতে বলি "আমি তোমারই দাসত্ব করি আর তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি" কার্যত যদি তাঁর দাসত্ব না করি তাঁকে যথাযথ প্রভু বলে না মানি অর্থা তাঁর হুকুমের পরিপন্থি কাজ করি তাহলে কি আল্লাহর কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতির হক আদায় হবে? আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হবে আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি ঠিক রাখতে হলে সক্রিয়ভাবে ইসলামী আন্দোলনে শরীক হতে হবেইসলামী আন্দোলনে শরীক না হলে সালাত কায়েমের হকও আদায় হবে নাসালাত কায়েম করা মানে তো একা একা নামায পড়া নয়ব্যক্তি জীবনে পরিবারে এবং সমাজে নামাযকে প্রতিষ্ঠিত করা মানে সালাত বা নামায কায়েম করাআমাদের সমাজে নামায কায়েম নেইএমনকি অনেক দ্বীনদার ব্যক্তির পরিবারেই নামায কায়েম নেইসমাজে নামায কায়েম করতে হলে আগে ইসলামকে কায়েম করতে হবেআর এজন্য যার মধ্যে তাকওয়া আছে সে অবশ্য ইসলাম কায়েমের আন্দোলনের বলিষ্ঠ কর্মী হবে
৭. সবরকারী হবেইসলামী আন্দোলন করতে গেলে তার উপর বিভিন্ন বিপদ-আপদ, মুসিবত আসবেতখন সে যেন ভয়ে দিশেহারা হয়ে সবকিছু ছেড়ে না দেয়সবরের সাথে যেন পরিস্থিতির মোকাবেলা করেআল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, "আমি ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি দিয়ে তোমাকে পরীক্ষা করবোএই পরীক্ষায় যারা ধৈর্য ধারণ করবে (হে নবী) তাকে সুসংবাদ দিন" (সূরা বাকারা)
৮. মুত্তাকিরা অশ্লীল ভাষী হবে না
৯. ঝগড়া ফ্যাসাদ করবে না
(একবার আমার এক প্রতিবেশী এসে বললÑ "আপা জানি তো ঝগড়া করলে রোযা নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু আমার 'জা' এতো সব বাজে কথা বলতে লাগলো শেষ পর্যন্ত নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম নাকিছু কথা বলেই ফেললাম ঝগড়া তো হয়েই গেলোআপা আমার রোযা কি নষ্ট হয়ে গেলো? বললামÑ "আপা যদি এমন হতো আপনার 'জা' এতো সুন্দর পিঠা তৈরী করেছে আর আপনাকে খাওয়ার জন্য এতোই অনুরোধ করছে শেষ পর্যন্ত  আপনি দু'টো খেয়েই ফেলেছেনকি বলেন, রোযা কি থাকতো না ভেঙ্গে যেতো?" খাদ্য সামনে আনলে যেমন খাওয়া যাবে না তেমনি ঝগড়া সামনে আনলেও তাতে অংশ নেয়া যাবে নারাসূল (সা.) তো শিখিয়েই দিলেন রোযার সময় কেউ ঝগড়া করতে এলে তাকে বলে দাও আমি রোযা আছি
ভদ্র মহিলা লজ্জিত হলেন, ভয় পেলেন "আর কখনো ঝগড়া করবেন না বলে তওবা করলেনরমজান তাকে এভাবেই এক মাস ঝগড়া না করার প্রশিক্ষণ দেয়।"
১০. মিথ্যা কথা বলবে না
১১. ফাহেশা কথা মানে গীবত চোগলখুরি প্রভৃতি বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কথা বলবে না
১২. মিথ্যা কাজ অর্থা যে কাজে দুনিয়া এবং আখেরাতের কোনো লাভ নেই সেসব কাজ করবে না
১৩. কোনো প্রকার অন্যায়, জুলুম, মানুষের কোনো ক্ষতিকর কাজ করবে না
১৪. অধীনস্থদের উপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপাবে নাখারাপ ব্যবহার করবে না
১৫. তার আচরণে কেউ যেন কষ্ট না পায় সেদিকে সতর্ক থাকবে সর্বক্ষণপরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, সহকর্মী, সহযাত্রী সে যেই হোক না কেন
১৬. আল্লাহর দ্বীনকে আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে থাকবে সদা তপরবিপদে, মুসিবতে, সংকটে, সংঘাতে অবিচল অটল থাকবে মুত্তাকি বা তাকওয়া সম্পন্ন মানুষটি
১৭. অর্থ উপার্জনের এমন কোনো পন্থা অবলম্বন করবে না যা হালাল নয়
১৮. কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী যা কিছু ভুল তা থেকে স্বযতনে নিজেকে দূরে রাখবে
১৯. আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে সব সময় ভীত থাকবে তাকওয়া সম্পন্ন মানুষটি
২০. নির্ধারিত ফরয ইবাদতের পরও যত্নের সাথে নফল ইবাদত করবেবিশেষ করে তাহাজ্জুদের নামাযকারণ এই এক মাস তো প্রতিদিনই শেষ রাতে উঠেছিএই অভ্যাসটা তো অবশ্যই হওয়া উচিত
২১. জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে তপর হবেপ্রতিদিন আল্ কোরআন, হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করবে নিষ্ঠার সাথে
২২. নফল রোযার প্রতি মহব্বত সৃষ্টি করতে হবেবিশেষ করে শাওয়াল মাসের ছয় রোযা, যিলহজ্জ মাসের রোযা, মহরমের নয়, দশ তারিখের রোযা এবং প্রতি মাসের তের, চৌদ্দ, পনের তারিখের রোযা
আসলে এসব রোযা তো প্রেমের রোযা, ভালোবাসার রোযারমজানের এক মাস রোযা রেখেছিলাম মহান আল্লাহর নির্দেশেরমজানের রোযা আমাদের উপর ফরয করা হয়েছেরমজানের রোযা করতে তো আমি বাধ্যএ রোযা তো ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটিএ রোযা না করলে  মুসলমানের খাতায় তার নামই থাকে নাকিন্তু নফল রোযার ব্যাপারটা তো ভিন্ননা করলে কোনো সমস্যা নেই, গুনাহ বা পাপ নেই কিন্তু করলে প্রচুর সওয়াববান্দা রোযা রাখলে আল্লাহ্ খুব খুশি হনআর মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনকে খুশি করাই তো মুমিন মুত্তাকিনের এক মাত্র কাজ
এমনি আরো অনেক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ হতে হবে তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তিকে

বর্তমান সমাজ
সমাজের দিকে তাকালে ব্যথায় বোবা হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়রোযার আগে থেকেই চলে ঈদের প্রস্তুতিরোযা পালন হোক চাই না হোক ঈদের আনন্দ চাই ষোল আনাবিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে ঈদের আনন্দের নামে অশ্লীলতা আর বেহায়াপনার প্রতিযোগিতা চলেতাকওয়া, পবিত্রতা সব দূরে নিপে করে পাপের মহড়া চলে সমাজের সর্বস্তরেসারা মাসের রোযা সম্পর্কিত ভালো ভালো কথা প্রবন্ধ আর বই পুস্তকের শিক্ষা চুপসে যায় ফাটা বেলুনের মতোআমাদের বাসা বাড়ি, রাস্তা ঘাট, দোকানপাট, বড় বড় বিপণী কেন্দ্র সর্বত্র আজদাহা নফসের স্বদর্প দৌড়াদৌড়িআর রূহ্ হয়ে গেছে নফসের আজ্ঞাবহ দাস
অনাচার, অবিচার, ব্যভিচার কিছুই বাদ দেয় না এই সব তথাকথিত রোযাদারেরাসব রকমের গুনাহের কাজকে এরা রোজা শেষে ঈদের আনন্দরূপে পালন করে
এসব দেখে সত্যি ভীত সন্ত্রস্তহয়ে পড়িভাবি আমার সিয়াম কবুল হবে তো?
বার বার বলি হে রব, আমি তোমারই দাসী, তোমারই দাসত্ব করি, আর সাহায্য চাই তোমারই কাছেআমার সিয়াম কবুল করো প্রভুআমাদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার মতা দাওইবলিস এবং তোমার অবাধ্য বান্দাদের কর্মকান্ডের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেইআমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ প্রতিটি পদক্ষেপ যেন হয় তোমারই সন্তুষ্টির জন্য
তুমি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকো প্রভু যেমন সন্তুষ্ট ছিলে তুমি রাসূল (সা.) এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতিআমাদের ঈমান বড় দুর্বল প্রভু; আমাদের ঈমানে দৃঢ়তা দাওইলম পূর্ণতা দাওতোমার খাস বান্দীদের খাতায় আমাদের নামটা লিখে নাওতাকওয়ায় পূর্ণ করে দাও আমাদের হৃদয়

সমাপ্ত
 

No comments