কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্য
ইসলামী শরীয়তের চার উৎস মূলের অন্যতম হচ্ছে, আল হাদীস পবিত্র আল
কুরআনের পরেই যার স্থান। হাদীস হচ্ছে- প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মাদ মোস্তফা
(সা.) এর মুখনিঃসৃত নিজস্ব বাণী ও কর্ম এবং রাসূল (সা.) কর্তৃক সাহাবায়ে
কেরাম(রা.) গনের বক্তব্য ও কর্মের অনুমোদন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কাজ
ও অনুমোদনের বিপরিত নয়, সাহাবায়ে কেরামের এমন সব কথা, কাজ ও অনুমোদন
হাদীসের মধ্যে গণ্য। হাদীসসমূহের মধ্যে এমন কতগুলো হাদীস রয়েছে যেগুলো
আল্লাহর নবী (সা.) নিজ জবানে বর্ণনা করলেও তা মহান আল্লাহ তায়া’লার নামে
বিবৃত হয়েছে। যেমন- ‘আল্লাহ তায়ালা বলেছেন’ কিংবা ‘মহান আল্লাহ তায়ালা
বলেন’ এভাবে উল্লেখ হয়েছে। হাদীস শাস্ত্র বিশারদ- মুহাদ্দিসদের কাছে এগুলো
‘হাদীসে কুদসী’ নামে পরিচিত।
হাদীসে কুদসীর অভিধানিক অর্থ : হাদীসের অর্থ আমরা ইতঃমধ্যেই জেনেছি। আর কুদসী হলো কুদস এর সম্বন্ধ-বিশেষণ। এ সম্বন্ধ-বিশেষন তাযীম ও সম্মানের অর্থবহ। অতএব হাদীসে-কুদসীর আভিধানিক অর্থ হলো সম্মানিত হাদীস।
হাদীসে কুদসীর পারিভাষিক সংজ্ঞা : পরিভাষায় এমন হাদীসকে হাদীসে কুদসী বলে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দিকে নিসবত করে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ তিনি তা আল্লাহর কথা হিসেবে বর্ণনা করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কেবল আল্লাহর কথাকে নিজের ভাষায় বর্ণনা করেন। যখন পরবর্তীতে কেউ এ ধরনের হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে, তখন সে বলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রব থেকে যা বর্ণনা করেছেন তাতে বলেন- অথবা বলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন বা অথবা আল্লাহ তাআলা বলেন, এভাবে উল্লেখ থাকে।
প্রথমটির উদাহরণ : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রব থেকে বর্ণনা করে বলেন আল্লাহর হাত ভরপুর, ব্যয় তা থেকে কমাতে পারে না, রাত ও দিনের নিরন্তর-বর্ষিত ব্যয়। [বুখারী]
দ্বিতীয়টির উদাহরণ : আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার বান্দার ধারণার কাছে। আমি তার সঙ্গে যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে কোনো মজমায় স্মরণ করে তবে আমি তাকে তার থেকেও উত্তম মজমায় স্মরণ করি। আর সে যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার দিকে এক এক হাত এগিয়ে আসি, যদি সে আমার দিকে একহাত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার দিকে একগজ এগিয়ে আসি, যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে তাহলে আমি তার দিকে দৌড়ে আসি। [মুসলিম]
আল কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্য : আল কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যগুলো হলো নিম্নরূপ- এক. আল কুরআনুল কারীম আল্লাহর কালাম, যার শব্দমালা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি অহীর মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। আল কুরআনের মাধ্যমে তিনি আরবদের চ্যালেঞ্জ করেছেন। আর তারা সে চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে সকল বিবেচনায় ব্যর্থ হয়েছে।
দুই. আল কুরআনুল কারীম কেবলমাত্র আল্লাহর দিকেই নিসবত করে উল্লেখ করা হয়। বলা হয় আল্লাহ তাআলা বলেছেন। আর হাদীসে কুদসী কখনো কখনো আল্লাহর নিসবত করে উল্লেখ করা হয়। এ সময় এ নিসবতের অর্থ হবে ইনশা তথা স্থাপন ও প্রবর্তন। অতঃপর বলা হবে: আল্লাহ তাআলা বলেছেন অথবা আল্লাহ তাআলা বলেন। আবার কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে নিসবত করেও উল্লেখ করা হয়। এ সময় এ নিসবতের অর্থ হবে বর্ণনা করা বা খবর দেয়া। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে মানুষকে সংবাদ দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে নিসবত করে হাদীসে কুদসী বর্ণনার সময় বলা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রবের পক্ষ থেকে বর্ণনা করে বলেন।
তিন. আল কুরআনুল কারীম পুরোটাই মুতাওয়াতির। অতএব তা প্রামাণিকতার বিচারে অকাট্য। পক্ষান্তরে অধিকাংশ হাদীসে কুদসী আখবারে আহাদ। অতএব তা প্রাণিকতার বিচারে ‘যান্নী’ বা সন্দেহের অবকাশযুক্ত। অনুরূপভাবে হাদীসে কুদসী সাহীহ, হাসান ও যাঈফও হতে পারে।
চার. আল কুরআনুল কারীম শব্দে ও অর্থে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আশা। অতএব তা শব্দ ও অর্থ উভয় বিবেচনাতেই অহী। পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসীর ভাব ও অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে আশা, আর এর শব্দগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে প্রয়োগকৃত। অতএব হাদীসে কুদসী ভাব ও অর্থগতভাবে অহী। এ কারণেই জমহুর মুহাদ্দেসীনের মতানুযায়ী হাদীসে কুদসীর (রিওয়াইয়া বিল মানা) অর্থগত বর্ণনা বৈধ রয়েছে। অর্থাৎ আক্ষরিকভাবে হাদীসে কুদসী বর্ণনা করা বাধ্যতামূলক নয়।
পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসী পাঠের ভিন্ন কোনো ছাওয়াব নেই। বরং দীনী ইলম চর্চার ক্ষেত্রে হাদীস অধ্যয়নের সাধারণ যে ছাওয়াব, কেবল তাই হাদীসে কুদসী পাঠ থেকে আশা করা যায়। আর নামাজের তিলাওয়াতে হাদীসে কুদসী তিলাওয়াত করা আদৌ শুদ্ধ নয়। [উলুমুল কুরআন: লেখক, ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক]
গুরুত্বপূর্ণ কিছু হাদিসে কুদসী : গুরুত্বপূর্ণ
কিছু বিষয়ভিত্তিক কিছু হাদীসে কুরসী এখানে উল্লেখ করা হলো। যাতে হাদীসে
কুদসীর পরিচয় ও সংজ্ঞা জানার পাশাপাশি কিছু হাদীসে কুদসী সম্পর্কে জ্ঞান
অর্জিত হয়।
শিরক ও তার পরিণতি বিষয়ক হাদিসে কুদসী
এক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহান আল্লাহ আমার প্রতি এমন কতগুলো প্রত্যাদেশ করেছেন যা আমার কানে প্রবেশ করেছে এবং আমার হৃদয়ে বসে গেছে। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, আমি যেন তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করি যে লোক মুশরিক অবস্থায় প্রাণ ত্যাগ করেছে। আর যে লোক তার অবশিষ্ট সম্পদ অপরকে বিলিয়ে দেয়, তা তার জন্য কল্যানকর। আর যে তা আকড়িয়ে রাখে, তার জন্য তা অনিষ্টকর। আর জীবিকার সমপরিমাণ সম্পদ সঞ্চিত রাখার জন্য আল্লাহ্ কাউকেও অভিসম্পাত করেন না [ইবনে জারীর এ হাদিসটি হযরত কাতাদা (রা.) থেকে মুরসাল হাদীস হিসাবে বর্ণনা করেছেন]
দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ বলেছেন,নিশ্চয়ই তোমার উম্মতগণ সর্বদা (তর্কচ্ছলে) বলতে থাকবে-এটা কিভাবে হল? এটা কিভাবে হল? এমনকি ‘পরিশেষে বলবে, এ সৃষ্টিকুলকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে কে? [ইমাম মুসলিম ও আবূ আওয়ানা এ হাদীসটি হযরত আনাস (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
শিরক না করার পুরস্কার বিষয়ক হাদিসে কুদসী
এক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহান ও পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেন, যে লোক কোন ভাল কাজ করে তার জন্য ওর দশগুন এবং তার চেয়েও বেশি পুরস্কার রয়েছে। আর যে লোক কোন খারাপ কাজ করে, এর প্রতিদান ওর সমপরিমান কিংবা আমি তা ক্ষমা করে দেই। আর যে লোক আমার সাথে কোন কিছু শরীক না করে পৃথিবী সমান পাপ করে তারপর আমার সাথে সাক্ষাত করে, আমি তাকে ওর সমপরিমাণ মার্জনা করে থাকি। আর আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দু’হাত অগ্রসর হই। যে লোক আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি দ্রুত পায়ে তার দিকে অগ্রসর হই। [আহমদ, মুসলিম, ইবনে মাজা ও আবূ আওয়ানা এ হাদীসটি হযরত আবূ যর (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহান মর্যাদাশীল আল্লাহ বলেছেন,যে লোক জানে যে, আমি যাবতীয় গুনাহ মাফের অধিকারী, তাকে আমি মাফ করে দেই। আর আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক না করা পর্যন্ত আমি কারো কোন দোষ ধরি না। [তিবরানী ও হাকেম এ হাদিসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
লোক দেখানো আমলের পরিণতি বিষয়ক হাদিসে কুদসী
এক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- কেয়ামতের দিন কিছু লোককে বেহেশতের দিকে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে। তারা যখন বেহেশতের কাছাকাছি হবে তখন তারা ওর সুঘ্রাণ পাবে এবং বেহেশতের প্রাসাদগুলো এবং আল্লাহ তাতে তার অধিবাসীদের জন্য যা কিছু তৈরী করেছেন, তার দিকে তাকাবে। তখন ডেকে বলা হবে, তাদেরকে ফিরিয়ে আন, ওতে ওদের কোন অংশ নেই তখন তারা হতাশ হয়ে ফিরে আসবে যেমনটি পূর্ববর্তীগণ কখনো ফিরে আসেনি। তারপর তারা বলবে, হে আমাদের রব, যদি তুমি আমাদেরকে তোমার প্রতিদানের বেহেশতে এবং তাতে তোমার বন্ধুদের জন্য যা তৈরি করে রেখেছ তা দেখানোর আগেই দোযখে প্রবেশ করাতে, তবে আমাদের জন্য সহজ হত। আল্লাহ বলবেন, ওরে পাপিষ্টরা, তোদের (শাস্তির) জন্য আমি এই মনস্থ করেছি। তোমরা যখন নিরালায় থাকতে তখন বড় বড় পাপ করে আমার মুকাবিলা করতে, আর যখন লোকদের মধ্যে আসতে তখন তাদের সাথে বিনয়ের সাথে দেখা করতে। মনে মনে তোমরা আমাকে যেরূপ বড় মনে করতে, মানুষদেরকে তার উল্টা দেখাতে। তোমরা মানুষকে ভয় করতে কিন্তু আমাকে আমাকে করতে না, মানুষকে বড় মনে করতে, কিন্তু আমাকে করতে না তোমরা মানুষের জন্য নিজেকে পবিত্র সাজাতে, কিন্তু আমার জন্য সাজাতে না এ জন্য আমি যে আজ তোমাদেরকে বেহেশতে থেকে বঞ্চিত করেছি (তার উদ্দেশ্য ) তা দিয়ে তোমাদেরকে শাস্তি দিব [তিবরানী এ হাদীসটি হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ তাঁর কোন এক কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন এবং তাঁর কোন এক নবীর প্রতি প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছেন, ঐ সকল লোকদেরকে বল, যারা দীন-ধর্ম ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আমলের উদ্দেশ্য ছাড়া জ্ঞান অর্জন করে এবং পরকালীন আমলের বিনিময়ে পৃথিবী অন্বেষণ করে, আর ভেড়ার চামড়ার লেবাস পরিধান করে, আর তাদের হ্রদয় নেকড়ের অন্তরের ন্যায় এবং তাদের ভাষা মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং ধার্মিকের বেশে দুনিয়া অর্জনে আত্ন নিয়োগ কারী এ ভন্ড প্রবঞ্চকদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ্ কঠোর সর্তকবানী করেছেন। আল্লাহ তাদের সামনে এমন কঠিন পরীক্ষা উপস্থিত করবেন বলে কসম করেছেন যে, তা অতি চালাক লোককেও স্তম্ভিত করে তুলবে। তাদের হৃদয় মুসাব্বর গাছের চেয়েও বেশি তিতা। আর কি আমাকেই প্রবঞ্চিত করছে, না আমার প্রতি উপহাস করছে? এতএব আমি নিজের নামে কসম করলাম, তাদের জন্য আমি এরূপ বিশৃঙ্খলা নাযিল করব, যাতে তাদের মধ্যেকার অতিশয় দৃঢ়মনা জ্ঞানী ব্যক্তিও স্তম্ভিত হয়ে পড়বে। [আবূ সাঈদ সুক্কাশ ও ইবনু ন্নাজ্জার এ হাদীসটি হযরত আবুদ্ দারদা (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
হাদীসে কুদসীর অভিধানিক অর্থ : হাদীসের অর্থ আমরা ইতঃমধ্যেই জেনেছি। আর কুদসী হলো কুদস এর সম্বন্ধ-বিশেষণ। এ সম্বন্ধ-বিশেষন তাযীম ও সম্মানের অর্থবহ। অতএব হাদীসে-কুদসীর আভিধানিক অর্থ হলো সম্মানিত হাদীস।
হাদীসে কুদসীর পারিভাষিক সংজ্ঞা : পরিভাষায় এমন হাদীসকে হাদীসে কুদসী বলে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দিকে নিসবত করে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ তিনি তা আল্লাহর কথা হিসেবে বর্ণনা করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কেবল আল্লাহর কথাকে নিজের ভাষায় বর্ণনা করেন। যখন পরবর্তীতে কেউ এ ধরনের হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে, তখন সে বলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রব থেকে যা বর্ণনা করেছেন তাতে বলেন- অথবা বলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন বা অথবা আল্লাহ তাআলা বলেন, এভাবে উল্লেখ থাকে।
প্রথমটির উদাহরণ : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রব থেকে বর্ণনা করে বলেন আল্লাহর হাত ভরপুর, ব্যয় তা থেকে কমাতে পারে না, রাত ও দিনের নিরন্তর-বর্ষিত ব্যয়। [বুখারী]
দ্বিতীয়টির উদাহরণ : আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার বান্দার ধারণার কাছে। আমি তার সঙ্গে যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে কোনো মজমায় স্মরণ করে তবে আমি তাকে তার থেকেও উত্তম মজমায় স্মরণ করি। আর সে যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার দিকে এক এক হাত এগিয়ে আসি, যদি সে আমার দিকে একহাত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার দিকে একগজ এগিয়ে আসি, যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে তাহলে আমি তার দিকে দৌড়ে আসি। [মুসলিম]
আল কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্য : আল কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যগুলো হলো নিম্নরূপ- এক. আল কুরআনুল কারীম আল্লাহর কালাম, যার শব্দমালা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি অহীর মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। আল কুরআনের মাধ্যমে তিনি আরবদের চ্যালেঞ্জ করেছেন। আর তারা সে চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে সকল বিবেচনায় ব্যর্থ হয়েছে।
দুই. আল কুরআনুল কারীম কেবলমাত্র আল্লাহর দিকেই নিসবত করে উল্লেখ করা হয়। বলা হয় আল্লাহ তাআলা বলেছেন। আর হাদীসে কুদসী কখনো কখনো আল্লাহর নিসবত করে উল্লেখ করা হয়। এ সময় এ নিসবতের অর্থ হবে ইনশা তথা স্থাপন ও প্রবর্তন। অতঃপর বলা হবে: আল্লাহ তাআলা বলেছেন অথবা আল্লাহ তাআলা বলেন। আবার কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে নিসবত করেও উল্লেখ করা হয়। এ সময় এ নিসবতের অর্থ হবে বর্ণনা করা বা খবর দেয়া। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে মানুষকে সংবাদ দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে নিসবত করে হাদীসে কুদসী বর্ণনার সময় বলা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রবের পক্ষ থেকে বর্ণনা করে বলেন।
তিন. আল কুরআনুল কারীম পুরোটাই মুতাওয়াতির। অতএব তা প্রামাণিকতার বিচারে অকাট্য। পক্ষান্তরে অধিকাংশ হাদীসে কুদসী আখবারে আহাদ। অতএব তা প্রাণিকতার বিচারে ‘যান্নী’ বা সন্দেহের অবকাশযুক্ত। অনুরূপভাবে হাদীসে কুদসী সাহীহ, হাসান ও যাঈফও হতে পারে।
চার. আল কুরআনুল কারীম শব্দে ও অর্থে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আশা। অতএব তা শব্দ ও অর্থ উভয় বিবেচনাতেই অহী। পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসীর ভাব ও অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে আশা, আর এর শব্দগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে প্রয়োগকৃত। অতএব হাদীসে কুদসী ভাব ও অর্থগতভাবে অহী। এ কারণেই জমহুর মুহাদ্দেসীনের মতানুযায়ী হাদীসে কুদসীর (রিওয়াইয়া বিল মানা) অর্থগত বর্ণনা বৈধ রয়েছে। অর্থাৎ আক্ষরিকভাবে হাদীসে কুদসী বর্ণনা করা বাধ্যতামূলক নয়।
পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসী পাঠের ভিন্ন কোনো ছাওয়াব নেই। বরং দীনী ইলম চর্চার ক্ষেত্রে হাদীস অধ্যয়নের সাধারণ যে ছাওয়াব, কেবল তাই হাদীসে কুদসী পাঠ থেকে আশা করা যায়। আর নামাজের তিলাওয়াতে হাদীসে কুদসী তিলাওয়াত করা আদৌ শুদ্ধ নয়। [উলুমুল কুরআন: লেখক, ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক]
গুরুত্বপূর্ণ কিছু হাদিসে কুদসী : গুরুত্বপূর্ণ
কিছু বিষয়ভিত্তিক কিছু হাদীসে কুরসী এখানে উল্লেখ করা হলো। যাতে হাদীসে
কুদসীর পরিচয় ও সংজ্ঞা জানার পাশাপাশি কিছু হাদীসে কুদসী সম্পর্কে জ্ঞান
অর্জিত হয়।শিরক ও তার পরিণতি বিষয়ক হাদিসে কুদসী
এক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহান আল্লাহ আমার প্রতি এমন কতগুলো প্রত্যাদেশ করেছেন যা আমার কানে প্রবেশ করেছে এবং আমার হৃদয়ে বসে গেছে। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, আমি যেন তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করি যে লোক মুশরিক অবস্থায় প্রাণ ত্যাগ করেছে। আর যে লোক তার অবশিষ্ট সম্পদ অপরকে বিলিয়ে দেয়, তা তার জন্য কল্যানকর। আর যে তা আকড়িয়ে রাখে, তার জন্য তা অনিষ্টকর। আর জীবিকার সমপরিমাণ সম্পদ সঞ্চিত রাখার জন্য আল্লাহ্ কাউকেও অভিসম্পাত করেন না [ইবনে জারীর এ হাদিসটি হযরত কাতাদা (রা.) থেকে মুরসাল হাদীস হিসাবে বর্ণনা করেছেন]
দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ বলেছেন,নিশ্চয়ই তোমার উম্মতগণ সর্বদা (তর্কচ্ছলে) বলতে থাকবে-এটা কিভাবে হল? এটা কিভাবে হল? এমনকি ‘পরিশেষে বলবে, এ সৃষ্টিকুলকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে কে? [ইমাম মুসলিম ও আবূ আওয়ানা এ হাদীসটি হযরত আনাস (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
শিরক না করার পুরস্কার বিষয়ক হাদিসে কুদসী
এক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহান ও পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেন, যে লোক কোন ভাল কাজ করে তার জন্য ওর দশগুন এবং তার চেয়েও বেশি পুরস্কার রয়েছে। আর যে লোক কোন খারাপ কাজ করে, এর প্রতিদান ওর সমপরিমান কিংবা আমি তা ক্ষমা করে দেই। আর যে লোক আমার সাথে কোন কিছু শরীক না করে পৃথিবী সমান পাপ করে তারপর আমার সাথে সাক্ষাত করে, আমি তাকে ওর সমপরিমাণ মার্জনা করে থাকি। আর আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দু’হাত অগ্রসর হই। যে লোক আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি দ্রুত পায়ে তার দিকে অগ্রসর হই। [আহমদ, মুসলিম, ইবনে মাজা ও আবূ আওয়ানা এ হাদীসটি হযরত আবূ যর (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহান মর্যাদাশীল আল্লাহ বলেছেন,যে লোক জানে যে, আমি যাবতীয় গুনাহ মাফের অধিকারী, তাকে আমি মাফ করে দেই। আর আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক না করা পর্যন্ত আমি কারো কোন দোষ ধরি না। [তিবরানী ও হাকেম এ হাদিসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
লোক দেখানো আমলের পরিণতি বিষয়ক হাদিসে কুদসী
এক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- কেয়ামতের দিন কিছু লোককে বেহেশতের দিকে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে। তারা যখন বেহেশতের কাছাকাছি হবে তখন তারা ওর সুঘ্রাণ পাবে এবং বেহেশতের প্রাসাদগুলো এবং আল্লাহ তাতে তার অধিবাসীদের জন্য যা কিছু তৈরী করেছেন, তার দিকে তাকাবে। তখন ডেকে বলা হবে, তাদেরকে ফিরিয়ে আন, ওতে ওদের কোন অংশ নেই তখন তারা হতাশ হয়ে ফিরে আসবে যেমনটি পূর্ববর্তীগণ কখনো ফিরে আসেনি। তারপর তারা বলবে, হে আমাদের রব, যদি তুমি আমাদেরকে তোমার প্রতিদানের বেহেশতে এবং তাতে তোমার বন্ধুদের জন্য যা তৈরি করে রেখেছ তা দেখানোর আগেই দোযখে প্রবেশ করাতে, তবে আমাদের জন্য সহজ হত। আল্লাহ বলবেন, ওরে পাপিষ্টরা, তোদের (শাস্তির) জন্য আমি এই মনস্থ করেছি। তোমরা যখন নিরালায় থাকতে তখন বড় বড় পাপ করে আমার মুকাবিলা করতে, আর যখন লোকদের মধ্যে আসতে তখন তাদের সাথে বিনয়ের সাথে দেখা করতে। মনে মনে তোমরা আমাকে যেরূপ বড় মনে করতে, মানুষদেরকে তার উল্টা দেখাতে। তোমরা মানুষকে ভয় করতে কিন্তু আমাকে আমাকে করতে না, মানুষকে বড় মনে করতে, কিন্তু আমাকে করতে না তোমরা মানুষের জন্য নিজেকে পবিত্র সাজাতে, কিন্তু আমার জন্য সাজাতে না এ জন্য আমি যে আজ তোমাদেরকে বেহেশতে থেকে বঞ্চিত করেছি (তার উদ্দেশ্য ) তা দিয়ে তোমাদেরকে শাস্তি দিব [তিবরানী এ হাদীসটি হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন]
দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ তাঁর কোন এক কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন এবং তাঁর কোন এক নবীর প্রতি প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছেন, ঐ সকল লোকদেরকে বল, যারা দীন-ধর্ম ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আমলের উদ্দেশ্য ছাড়া জ্ঞান অর্জন করে এবং পরকালীন আমলের বিনিময়ে পৃথিবী অন্বেষণ করে, আর ভেড়ার চামড়ার লেবাস পরিধান করে, আর তাদের হ্রদয় নেকড়ের অন্তরের ন্যায় এবং তাদের ভাষা মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং ধার্মিকের বেশে দুনিয়া অর্জনে আত্ন নিয়োগ কারী এ ভন্ড প্রবঞ্চকদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ্ কঠোর সর্তকবানী করেছেন। আল্লাহ তাদের সামনে এমন কঠিন পরীক্ষা উপস্থিত করবেন বলে কসম করেছেন যে, তা অতি চালাক লোককেও স্তম্ভিত করে তুলবে। তাদের হৃদয় মুসাব্বর গাছের চেয়েও বেশি তিতা। আর কি আমাকেই প্রবঞ্চিত করছে, না আমার প্রতি উপহাস করছে? এতএব আমি নিজের নামে কসম করলাম, তাদের জন্য আমি এরূপ বিশৃঙ্খলা নাযিল করব, যাতে তাদের মধ্যেকার অতিশয় দৃঢ়মনা জ্ঞানী ব্যক্তিও স্তম্ভিত হয়ে পড়বে। [আবূ সাঈদ সুক্কাশ ও ইবনু ন্নাজ্জার এ হাদীসটি হযরত আবুদ্ দারদা (রা.) থেকে সংগ্রহ করেছেন]

No comments
Post a Comment